গাজীপুরের কোনাবাড়ির দেউলিয়াবাড়ি এলাকায় একটি ঝুটের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সময় শনিবার (৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
গাজীপুরে ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কোনাবাড়ি ইউনিটসহ মোট ৬টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। আগুনে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও আশেপাশের বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটিম্যান মো. সাগর আহমেদ বলেন, “আমরা বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হই। আগুনের ধোঁয়া অনেক দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমাদের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।”
গাজীপুরে দেউলিয়াবাড়ি এলাকার ঝুট গুদামে আগুন লাগার ফলে পুরো এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ঝুট হচ্ছে কাপড়ের টুকরো ও বর্জ্য, যা অত্যন্ত দাহ্য। ফলে আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই তা বিস্তৃত হয়ে পড়ে। আশেপাশের বাড়িঘরেও আগুন ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাড়াহুড়া করে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হন।

গাজীপুর স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, “আগুন লাগার পর চারপাশে ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি কী হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আগুন আমাদের বাড়ির দিকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা ঘর ছেড়ে বাইরে চলে আসি।”
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় ঝুট গুদামে আগুন লাগার ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ শিল্প এলাকা ঘিরে থাকা এই গুদামগুলো প্রায়ই নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়। এসব স্থানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় আগুন লাগলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গুদামের ভেতরের কোনো বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা অসাবধানতার কারণে আগুন লাগতে পারে। তবে তদন্তের আগে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা সম্ভব নয়। আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি এবং চেষ্টা করছি যাতে তা আরও ছড়িয়ে না পড়ে।”
আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে ইউনিট পাঠানো হয়। দ্রুত পদক্ষেপের ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু হয়।
এক ফায়ার কর্মী জানান, “আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের বারবার পানির উৎস খুঁজে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এলাকাটিতে পানির স্বল্পতা থাকায় আমাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।”
গাজীপুরে ঝুট গুদামে আগুন লাগার ফলে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব ঝুট গুদামে সাধারণত তৈরি পোশাক শিল্পের বর্জ্য সামগ্রী জমিয়ে রাখা হয়, যা পুনর্ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হয়ে থাকে। আগুনে পুড়ে যাওয়া এই গুদামের মালিকদের অনেক বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
এছাড়াও গুদামের আশেপাশে থাকা বেশ কয়েকটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষদের জীবিকা ও বসতঘর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পর গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন এলাকা পরিদর্শন করে। তারা জানিয়েছে, এ ধরনের গুদামগুলোতে যথাযথ অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনুমোদনহীন গুদামগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা তদন্ত করে দেখব, এই গুদামটির বৈধতা ছিল কি না এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হবে।”
ঝুট গুদামে আগুন লাগা শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব ও অবহেলার বহিঃপ্রকাশ। দ্রুত পদক্ষেপ ও সচেতনতা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটবে, যা মানুষের জীবনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ব্যবসায়ী সমাজের সচেতনতা-ই পারে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধ করতে।
আগুন লাগার পরপরই অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় এসে আশ্রয় নেন। আগুনের ভয়াবহতায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বেশ কয়েকটি পরিবার তাদের জিনিসপত্র সরাতে পারেনি বলেও জানা গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া গুদাম ঘরগুলোর কাছাকাছি বসবাসকারী লোকজন এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এক ক্ষতিগ্রস্ত নারী বলেন, “আমাদের বাড়ির খুব কাছেই আগুন লাগে। আমরা দ্রুত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাইরে চলে আসি। কোনো কিছুই ঘর থেকে বের করতে পারিনি। শুধু প্রাণ বাঁচানোই তখন আমাদের একমাত্র চিন্তা ছিল।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। তারা বলেন, গৃহহীন পরিবারগুলোর অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা হবে এবং প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দাহ্য উপাদান রাখার স্থানে যথাযথ অগ্নি-নির্বাপক সরঞ্জাম থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। ঝুট গুদামগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের আওতায় আনা দরকার।
অগ্নি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম বলেন, “শিল্প এলাকায় গুদাম বা কারখানা পরিচালনার আগে নিরপত্তা পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো ঝুট গুদাম যেন চালু না হয়, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।”








