সায়ন্তনী সেন, পথে প্রান্তরে
নারীর জীবনে মাসিক একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতি মাসে একবার এ অভিজ্ঞতা আসে এবং অনেক সময় তা শারীরিক ও মানসিকভাবে অস্বস্তিকর হয়। মাসিকের সময় অনেক নারীর পেট ব্যথা, কোমর ব্যথা, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, হজমে সমস্যা কিংবা ঘুমের ব্যাঘাত হয়। এ সময় শরীরের হরমোনের তারতম্যের কারণে স্বাভাবিক খাবারও কখনো কখনো অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই মাসিকের সময়ে কী খাবেন এবং কী এড়িয়ে চলবেন, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের ফিচারে বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করব, মাসিকের সময়ে কোন খাবারগুলো কম খাওয়া বা এড়িয়ে চলা ভালো এবং কেন।
মাসিকের সময়ে শরীরে কী পরিবর্তন হয়?
মাসিকের সময় হরমোন—বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন—মাত্রার ওঠানামা হয়। এই পরিবর্তন শরীরের বিভিন্ন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে:
- প্রদাহ ও ব্যথা: জরায়ুর সংকোচন বাড়ে, ফলে তলপেটে ব্যথা হয়।
- হজমের সমস্যা: অনেকেরই গ্যাস, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া হয়।
- পানি জমা ও ফোলাভাব: শরীরে অতিরিক্ত লবণ থাকলে এটি আরও বেড়ে যায়।
- মেজাজের ওঠানামা: সেরোটোনিন কমে যাওয়ায় খিটখিটে ভাব, দুঃখ বা ক্লান্তি দেখা দেয়।
এই পরিবর্তনগুলোর প্রভাব কমাতে হলে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলা ভালো?
১. অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার
প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস, আচার, বার্গার, পিজা, ফাস্টফুডে লবণের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। লবণ শরীরে পানি জমিয়ে রাখে, ফলে পেট ফাঁপা ও ফোলাভাব বাড়ে। মাসিকের সময়ে য ohnehin bloating হয়, তা আরও বেড়ে যায়। তাই এ সময় কম লবণযুক্ত ঘরোয়া খাবার খাওয়া ভালো।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন
কফি, চা, এনার্জি ড্রিংকস বা কোলা জাতীয় পানীয়তে ক্যাফেইন থাকে। এটি ডিহাইড্রেশন ঘটায়, ঘুমের সমস্যা তৈরি করে এবং অনেকের ক্ষেত্রে মাথা ব্যথা বাড়ায়। আবার অতিরিক্ত ক্যাফেইন জরায়ুর রক্তনালিকে প্রভাবিত করে ব্যথা বাড়াতে পারে। তাই মাসিকের সময়ে দিনে এক কাপের বেশি কফি বা চা না খাওয়াই ভালো।
৩. চিনি ও প্রক্রিয়াজাত মিষ্টি খাবার
চকোলেট, কেক, সফট ড্রিংকস, মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায়, তারপর আবার দ্রুত কমায়। এর ফলে মুড সুইং, ক্লান্তি ও বিরক্তি বাড়তে পারে। এ ধরনের খাবার খেলে সাময়িক ভালো লাগলেও পরে শরীর আরও অবসন্ন হয়ে পড়ে। তাই এ সময় বেশি মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার
ডিপ ফ্রাই করা খাবার, তেলেভাজা স্ন্যাকস বা বেশি তেলযুক্ত রান্না শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। এর ফলে জরায়ুর ব্যথা তীব্র হতে পারে এবং হজমের সমস্যা বাড়ে। তাছাড়া এ ধরনের খাবার খেলে অনেক সময় বমিভাবও তৈরি হয়।
৫. অ্যালকোহল
অ্যালকোহল শরীরকে ডিহাইড্রেট করে, ঘুমের মান কমিয়ে দেয় এবং মুড সুইং বাড়ায়। মাসিকের সময় য ohnehin শরীর দুর্বল থাকে, সেখানে অ্যালকোহল তা আরও খারাপ করে তোলে। তাই এ সময়ে একেবারেই না খাওয়াই ভালো।
যেসব খাবার পরিমিত খাওয়া উচিত
১. ডেইরি পণ্য
দুধ, পনির, দই—এসব খাবারে ক্যালসিয়াম থাকে যা মাসিকের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে দুধজাত খাবার প্রদাহ বা গ্যাসের সমস্যা বাড়ায়। তাই যাদের সমস্যা হয়, তাদের জন্য পরিমিত খাওয়াই ভালো। দই বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে, কারণ প্রোবায়োটিক হজমে সাহায্য করে।
২. লাল মাংস
লাল মাংসে আয়রন থাকে, যা রক্তক্ষরণের সময় শরীরের জন্য দরকার। তবে এতে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামক উপাদানও থাকে যা জরায়ুর সংকোচন বাড়াতে পারে। তাই লাল মাংস খাওয়া যাবে, তবে সীমিত পরিমাণে।
৩. ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার
কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝাল হজমে সমস্যা, গ্যাস বা ডায়রিয়া বাড়িয়ে দেয়। তাই যাদের শরীরে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তাদের এড়িয়ে চলা উচিত। তবে কারও কোনো সমস্যা না হলে সামান্য ঝাল খাওয়া ক্ষতিকর নয়।
তাহলে কী খাবেন?
মাসিকের সময়ে একেবারে না খাওয়ার তালিকার পাশাপাশি কী খাওয়া উচিত সেটাও জানা দরকার। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু খাবার উপসর্গ লাঘবে সাহায্য করে:
- পাতাযুক্ত শাকসবজি (পালং, কেল): আয়রন ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
- বাদাম ও বীজ (আখরোট, কাঠবাদাম, কুমড়ার বীজ): ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও ম্যাগনেসিয়াম আছে, যা প্রদাহ কমায়।
- মাছ (স্যামন, সার্ডিন): ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ, ব্যথা কমায়।
- ফল (কলা, কমলা, বেরি): ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর।
- পর্যাপ্ত পানি: ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বিভিন্ন নিউট্রিশন রিসার্চের মতে, মাসিকের সময় খাদ্যাভ্যাসে কঠোর নিষেধাজ্ঞার দরকার নেই। বরং প্রতিটি নারী নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে খাবার বেছে নেবেন। কারও দুধ খেলে সমস্যা হয়, কারও আবার আরাম হয়। কেউ ঝাল খেলে কষ্ট পান, কেউ পান না।
পুষ্টিবিদদের মতে:
“মাসিকের সময় কোনো খাবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে যেসব খাবারে লবণ, ক্যাফেইন, প্রক্রিয়াজাত চিনি ও অতিরিক্ত তেল আছে, সেগুলো কমানো উচিত। আবার আয়রন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীর দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে পারে।”
মাসিক নারীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সময়ে সঠিক খাবার নির্বাচন করলে অস্বস্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণ, ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও তেলেভাজা খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, বাদাম, মাছ ও পর্যাপ্ত পানি শরীরকে সতেজ রাখে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিটি নারীর শরীর ভিন্ন। কারও জন্য যা ক্ষতিকর, অন্যের জন্য তা নাও হতে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা, পরিমিত খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।








