শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বরিশাল-৫ আসন: চ্যালেঞ্জে বিএনপি, সুবিধাজনক স্থানে ইসলামী দল

ব্যুরো চিফ, বরিশাল

একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বরিশাল-৫ (সদর) আসন আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মহানগর বিএনপির মধ্যে একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এর মধ্যে আগেভাগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী ঘোষণা করায় তারা নির্বাচনী মাঠে থাকলেও বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় একাধিক প্রার্থী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন।

স্বাধীনতার পরবর্তী এবারের নির্বাচনে বড় একটি দল না থাকায় সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তার মধ্যে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সাধারণ ভোটাররা আড় চোখে দেখায় বিএনপি থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক না কেন তাকে বিজয়ের তোড়ন উড়ানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল মহানগর বিএনপি একাধিক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে মহানগর বিএনপির বাইরে যারা রয়েছেন তারা অধিকাংশই বিভক্তি এড়িয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন এ আসনের নতুন মুখের ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহর পক্ষে।

সূত্র মতে, মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে সংসদ নির্বাচনে।

সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন—বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার, উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, পদ স্থগিত হওয়া সাবেক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরীন, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ এবায়দুল হক চান, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন।

অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা নিয়ে প্রার্থী হবেন চরমোনাই পীরের ভাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন বরিশাল জেলার উপদেষ্টা মুফতি সুলতান মাহমুদ। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুরদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত বাসদের বরিশাল জেলার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী।

এ আসনে এনসিপি থেকে এখনও কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।

বিশেষ এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে—১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ আসনে দুটি উপনির্বাচনসহ ১০টি নির্বাচনের মধ্যে আটটিতে জয় পেয়েছিল বিএনপি। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার করে বিজয়ী হয়েছে।

এ আসনে চারবারের এমপি ছিলেন মজিবর রহমান সরোয়ার। এছাড়া প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তার ছেলে ডা. এহতাশেমুল হক নাসিম বিশ্বাস উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বারবার বিএনপি এ আসনে নির্বাচিত হওয়ায় এটিকে বিএনপির ঘাঁটি বলা হয়।

তবে এবারের নির্বাচন সব পরিসংখ্যান পাল্টে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগের নীরব ভোট এ পরিসংখ্যান পাল্টে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তার মধ্যে বিএনপির একাধিক ভাগে বিভক্ত এবং বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

আর বিএনপির এসব দুর্বল জায়গায় আঘাত হেনে ভোটের মাঠে রাজত্ব করতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী এ দুটি দলের প্রার্থীরা ভোটারের দ্বারে দ্বারে ছুটে চললেও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ব্যতীত অন্য সব মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তাদের নিজস্ব বলয় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা এখন পর্যন্ত ভোটারের কাছেই যেতে পারেননি।

সূত্র মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম। সর্বশেষ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ভোট। এ কারণে তাদের নির্বাচনী মাঠ অনেকটা হাতের নাগালে।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বরিশাল সদর আসনের প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকে একটি মুহূর্ত বসে থাকেননি অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। তিনি সদর আসনের প্রতিটি অলিগলি থেকে শুরু করে ভোটারের দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়াচ্ছেন।

সূত্রে আরও জানা গেছে, যেখানে বিএনপি এখন পর্যন্ত প্রার্থীই ঠিক করতে পারেনি, সেখানে জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে তাদের ভোটকেন্দ্রের কর্তব্যরতদের নিয়ে কয়েক দফা সচেতনতামূলক সভা করেছেন।

অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিটি কর্মসূচিতে হাতপাখা প্রতীকের পাশাপাশি প্রার্থী ফয়জুল করীম ভোট চাইছেন। তারা পিআর পদ্ধতিতে ভোটে যেতে চাইলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

সার্বিক বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার জনকণ্ঠকে বলেন, বড় দলে বিভক্তি থাকতে পারে। তবে দল মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর সেই বিভক্তি আর থাকে না। ওই সময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নির্বাচনী মাঠে থাকবেন সকল নেতাকর্মীরা। তিনি আরও বলেন—আমি চারবারের এমপি, সাবেক হুইপ এবং প্রথম সিটি মেয়র। সেই স্থান থেকে আমি মনোনয়ন চাইব এটাই স্বাভাবিক।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আগামী নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে আমি দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর দলের মধ্যে আর গ্রুপ থাকবে না।

বিএনপির অন্যসব প্রার্থীর চেয়ে এ আসনে ব্যাপক আলোচনায় থাকা ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন—বিভাগীয় শহর হওয়ায় বরিশাল সদর আসনের গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন—ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন বরিশালের রাজপথে থেকে অবহেলিত বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মূল্যায়নের চেষ্টা করে সর্বদা রাজপথে সরব রেখেছি। এ কারণেই বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ ভোটারদের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। আশা করছি দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৃণমূল থেকে শুরু করে তরুণ ভোটারদের চাওয়াকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, সারাদেশের মতো বরিশাল সদর আসনেও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ এবার প্রকৃত পরিবর্তন চাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী দুঃশাসনের সময় আমাদের নেতৃবৃন্দকে জুলুমের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীনতার পরে এ দেশে অনেক শাসন হয়েছে, শাসনের নামে শোষণ হয়েছে কিন্তু মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য দরকার রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নির্ধারিত পদ্ধতিতে সমাজ পরিচালনা করা। তাহলে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে।

অতীত নির্বাচনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বরিশাল-৫ (সদর) আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে আবদুল মান্নান হাওলাদার, ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে সুনীল কুমার গুপ্ত, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির এম. মতিউর রহমান, ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে আবদুর রহমান বিশ্বাস, ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে মজিবর রহমান সরোয়ার, ১৯৯৬ সালের উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে নাসিম বিশ্বাস। নাসিম বিশ্বাসের মৃত্যুর পর ১৯৯৮ সালের উপনির্বাচন থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিনবার মজিবর রহমান সরোয়ার নির্বাচিত হয়েছেন।

এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে শওকত হোসেন হিরন, হিরনের মৃত্যুর পর ২০১৪ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে হিরনের পত্নী জেবুন্নেছা আফরোজ, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার আওয়ামী লীগ থেকে জাহিদ ফারুক শামীম এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

বিগত নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে—বরিশাল সদর আসনে বিএনপির ভোট রয়েছে ৬০ হাজার, আওয়ামী লীগের ৩৫ হাজার এবং ইসলামী দলগুলোর জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মিলে প্রায় ৫০ হাজার। সেক্ষেত্রে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে নতুন ভোটারের সংখ্যা। কারণ নতুন ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকবেন সেদিকেই জয়ের পাল্লা ভারি হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ