শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাসিনার ‘হেলিকপ্টার থেকে গুলির নির্দেশ’ প্রমাণিত হয়েছে: চিফ প্রসিকিউটর

পথে প্রান্তরে প্রতিবেদন 

জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় স্বৈরাচার হাসিনার ‘হেলিকপ্টার থেকে গুলির নির্দেশ’ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, হাসিনা তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে নিশ্চিত করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যারও নির্দেশ দিয়েছেন। হাসনুল হক ইনুকে তিনি নিশ্চিত করছেন যে, নারায়ণগঞ্জে হেলিকপ্টার থেকে ছাত্রীসেনা নামানো হবে এবং উপর থেকে ‘বোমিং’ করা হবে, ‘প্যারাট্রুপার’ নামানো হবে।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চতুর্থ দিনের যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে এ দিন দুটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবারও প্রসিকিউশন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে।

স্বৈরাচার হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চিফ প্রসিকিউটর।

এর আগে মঙ্গলবার হাসিনার সঙ্গে হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলে নূর তাপস ও এস এম মাকসুদ কামালের কথোপকথনের অডিও আদালতে শোনানো হয়।

তাজুল বলেন, এ সমস্ত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অর্থাৎ সারাদেশব্যাপী ‘ওয়াইডস্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেমেটিক’ যে হামলার কথা আমরা বলছি, সেটি সংঘটনের জন্য তাঁর (শেখ হাসিনা) সরাসরি নির্দেশ প্রমাণিত হয়েছে।

হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনের যে অডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেখানে তাঁর কণ্ঠ সঠিক নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে করা হয়েছে সে বিষয়ে প্রসিকিউশনের তরফে বক্তব্য রাখার কথা বলেছেন চিফ প্রসিকিউটর।

তিনি বলেন, পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছি, বাংলাদেশের সিআইডি ফরেনসিক পরীক্ষা করে বলেছে এই কণ্ঠস্বর শেখ হাসিনার; এবং তার সঙ্গে যাদের কথা হয়েছে—শেখ ফজলে নূর তাপসের কণ্ঠস্বর তারা নিশ্চিত করেছেন। হাসানুল হক ইনুর কণ্ঠস্বর তারা নিশ্চিত করেছেন। মাকসুদ কামালের কণ্ঠও তারা নিশ্চিত করেছেন। এই কথোপকথনটি এআই দিয়ে করা হয়নি, সেটি তারা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাইরের দুইটি প্রতিষ্ঠান—বিবিসি এবং আল জাজিরা—ওরা তাদের কাছেই একটি আলাদা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এই কণ্ঠস্বর এআই দিয়ে করা হয়েছে কিনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে এটা হাসিনার কণ্ঠ, এআই দিয়ে করা নয়।

হত্যার নির্দেশনার ব্যাপারে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নির্দেশটি যে সত্যিকার অর্থেই শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন—পুলিশ বাহিনীর তৎকালীন প্রধান সরাসরি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা, হেলিকপ্টার ব্যবহার করার নির্দেশনা তিনি পেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোনে বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে টেলিফোন করে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তখন এ নির্দেশটি তাঁর অধস্তন কর্মকর্তাদের জানান। অধস্তন কর্মকর্তারা—অর্থাৎ ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিব, প্রলয় জোয়ার্দার—তারা কমান্ড সেক্টরের মাধ্যমে, ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন কমান্ড পোস্ট ও বিভিন্ন জায়গায় যে সমস্ত বাহিনীকে নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের কাছে এটি পৌঁছে দেওয়া হয়।

“ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী মারণাস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের যে প্রমাণ—এই কমান্ড বা এই হুকুমের প্রেক্ষিতে সেগুলোর বিস্তারিত প্রমাণ আমাদের ‘লাইভ উইটনেস’ যারা রয়েছেন তাদের প্রমাণ আমরা দেখিয়েছি। ‘ডকুমেন্টারি এভিডেন্স’ আমরা দেখিয়েছি। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট দেখিয়েছি, ভিডিও ফুটেজ—কীভাবে প্রাণঘাতী ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে,” যোগ করেন তাজুল ইসলাম।

চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, বিস্তারিত প্রমাণ এতটাই অকাট্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে—এ আদালতই না, যে কোনো আন্তর্জাতিক আদালত বা বিশ্বের যে কোনো দেশের আদালতে এ প্রমাণ তুলে ধরা হোক, অকাট্যভাবে আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হবে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে এই অপরাধগুলো ছিল ‘ওয়াইডস্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেমেটিক’। আন্তর্জাতিক আইন ও দেশীয় আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যে শর্ত লাগে—ওই শর্ত এই মামলায় পরিপূর্ণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

হেলিকপ্টার থেকে গুলির বিষয়ে তিনি বলেন, সেই সংক্রান্ত ‘ডিটেইলড ফ্লাইট চার্টার’ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সে ফ্লাইটগুলোর ডিউরেশন, কোন পাইলট অপারেট করেছেন—তাদের নাম ও ফোন নম্বর—all পাওয়া গেছে। ওই ফ্লাইটগুলোতে পাইলট ছাড়া কোনো সৈনিক বা অফিসার ছিলেন কি না—সেটাও দেখানো হয়েছে।

এছাড়া সেখানে কী কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে—কত রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছে তার হিসাব দিয়েছেন বলে তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সেখানে এসএমজি, লাইট মেশিনগান, শটগান, রাইফেল, সাউন্ড গ্রেনেড, স্টান গ্রেনেড—সবকিছুর হিসাব আছে। ভিডিও ফুটেজ, আহতদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ছবি, শহীদ ও আহতদের দেহ থেকে যে বুলেটগুলো বের করা হয়েছে—তারও বিশদভাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই চেইন—হুকুম দেওয়া থেকে মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর হওয়া এবং এর ফলে মানুষ মারা যাওয়া; তাদের দেহ থেকে কীভাবে বুলেট উদ্ধার হয়েছে, এসব বুলেট কোন গ্রেডের, কোন রাইফেল থেকে এসেছে, কাদের কাছ থেকে এসেছে—এসব কিছুর অকাট্য প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ