খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল
বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সঙ্গে নৌকা বাইচ এক ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ উৎসবের চিত্র তুলে ধরে। যেখানে নদীর দুই পাশে হাজারো দর্শক উল্লাস করে এবং মাঝিরা বৈঠা হাতে পাল্লা দিয়ে নৌকা চালায়। একই সঙ্গে কাঁসির আওয়াজ, বিভিন্ন রঙিন পোশাক পরা মাঝিরা নৌকায় উঠে গান-বাজনা ও জয়ধ্বনির মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে। এ সময় নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষ মুখরিত হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন পর বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর এলাকার সন্ধ্যা নদীতে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে রোমাঞ্চকর নৌকা বাইচ উপভোগ করতে সন্ধ্যা নদীর দুই পাড়ে জড়ো হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। বিকেল চারটায় সন্ধ্যা নদীর শিকারপুর বন্দর এলাকা থেকে নৌকা বাইচের উদ্বোধন করেন বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
নৌকা বাইচে বিভিন্ন নামের সুবিশাল ছয়টি নৌকা অংশগ্রহণ করে। উদ্বোধনের পর প্রতিটি নৌকার মাঝিদের একটানা বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, জয়ধ্বনি এবং কাঁসির আওয়াজে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। প্রতিযোগিতা প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে মেজর এম.এ. জলিল সেতু (ইচলাদী ব্রিজ) পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়।

এ সময় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজারো দর্শক সন্ধ্যা নদীর দুই তীরে ভিড় জমায়। অনেকে ছোট নৌকা ও ট্রলার ভাড়া করে নদীতে অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।
নদীর দুই পাড়ে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষের সামনে বিচিত্র সাজে সজ্জিত নৌকাগুলোতে অংশগ্রহণকারী মাঝিরা কাঁসি বাজিয়ে, গান গেয়ে ও একত্র জয়ধ্বনিতে বৈঠা চালায়। গানের তালে তালে বৈঠার টানে একে অপরকে পেছনে ফেলে সবার আগে পৌঁছানোর চেষ্টা চলতে থাকে। নৌকা বাইচকে ঘিরে পুরো উজিরপুর উপজেলাজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ বছর পর নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে বিশেষ আনন্দের সঞ্চার হয়।
গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া এই চিরচেনা নৌকা বাইচের আয়োজক ও পরিকল্পনাকারী উজিরপুর উপজেলার চৌকস নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, “এই উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।”
আরও পড়ুন:
তিনি আরও বলেন, “সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করে যুবসমাজকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে সুস্থধারার এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। আমরা প্রতিবছর এমন আয়োজন করার উদ্যোগ নেব। আশা করি, অন্য এলাকার মানুষও এটা দেখে অনুপ্রাণিত হবেন।”
উজিরপুরের পাশের গৌরনদী উপজেলা থেকে নৌকা বাইচ দেখতে আসা হাসান মাহমুদ বলেন, “দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন দেখে দারুণ উপভোগ করেছি। প্রতিবছর যেন এমন আয়োজন হয়, সেই প্রত্যাশা করছি।”

বাবুগঞ্জ থেকে আসা দর্শনার্থী মৌরিন আহম্মেদ আশা বলেন, “পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছি। অনেক দিন পর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দেখলাম। খুব ভালো লেগেছে। আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।”
নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে মাদারীপুরের রাজিহার উপজেলার বাসিন্দা লাজারুস খলিফার পরিচালনাধীন শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক নামের নৌকা। প্রতিযোগিতা শেষে অতিথিরা বিজয়ী দলসহ অংশগ্রহণকারী দলের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।








