খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল
মূল প্রজননকালে ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে সারাদেশে জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মৎস্য বিভাগ। এ সময় ১০ ইঞ্চির ছোট সব জাটকা ধরা, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, বিনিময় ও মজুত দণ্ডনীয় অপরাধ। আজ ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এ আইন অমান্য করলে এক বছর থেকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
জাটকা রক্ষায় বরিশালের জেলা প্রশাসন, জেলা মৎস্য অফিস, কোস্টগার্ড ও নৌ–পুলিশের সমন্বয়ে নদী ও সাগরে অভিযান পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
এর পূর্বে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে মূল প্রজনন মৌসুম হিসেবে গণ্য করে গত ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত উপকূলের ৭ হাজার ৩৪৩ বর্গকিলোমিটারের প্রধান প্রজননস্থলে সব ধরনের মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সারাদেশেই ইলিশের আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ ছিল।
আরও পড়ুন:
প্রজননকালের নিষেধাজ্ঞার মতো আজ ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতেও সারাদেশের সঙ্গে বরিশালের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ মৎস্য বিভাগের নানা ধরনের অভিযান চলবে। এসব অভিযানে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌ–পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
তবে এবারও জাটকা আহরণে নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর জন্য চার মাস খাদ্য সহায়তা দেবে সরকার। একই সঙ্গে বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ক্ষতিকর কারেন্ট জাল, বেড়জাল ও বেহুন্দি জালসহ অন্যান্য ক্ষতিকর মৎস্য আহরণ উপকরণ ও সরঞ্জামের ব্যবহার বন্ধে বিশেষ কম্বিং অপারেশন চলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত আহরণ উপকরণের সাহায্যে যে পরিমাণ জাটকাসহ অন্যান্য পোনা মাছ আহরণ হয়, তার এক শতাংশ রক্ষা পেলে বছরে অন্তত আরও এক লাখ টন ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে—দেশে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ ভাগই আহরিত হচ্ছে বরিশালের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় এলাকায়। কিন্তু সীমান্তের ওপারে অভিন্ন ৫৩টি নদ–নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে ইলিশের বিচরণস্থল হিসেবে বিবেচিত বরিশালসহ উপকূলীয় নদ–নদীগুলোতে অব্যাহত নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও মানববর্জ্য অবমুক্ত করায় ইলিশের অবাধ বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।
পাশাপাশি নাব্যতা সংকটের সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাবে নদীর পানির তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের ৫–৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ইলিশ ক্রমাগত গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে।
তবে নজরদারি বৃদ্ধির ফলে দেশে জাটকার উৎপাদন ২০১৫ সালে ৩৯ হাজার ২৬৮ কোটি থেকে ২০১৭ সালে ৪২ হাজার ২৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৪৪ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ইলিশের উৎপাদনও ২০২২–২৩ অর্থবছরে ৫.৭১ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
এরই মধ্যে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারাদেশেই ইলিশ পোনা–জাটকার আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্রে যাওয়ার আগে যেসব এলাকায় ইলিশ পোনা–জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে বরিশাল অঞ্চলে ছয়টি অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার সময় কঠোর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বরিশাল বিভাগজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা হিজলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম জানিয়েছেন—আন্ধারমানিক নদীতে নভেম্বর ও জানুয়ারি মাসকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে ওইসব এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একইভাবে নিম্ন মেঘনা নদী, শাহবাজপুর চ্যানেল ও তেঁতুলিয়া নদীতে এবং মতলব ছাড়াও ভেদরগঞ্জ উপজেলার মধ্যে অবস্থিত পদ্মা নদীর ২০ কিলোমিটার এলাকার অভয়াশ্রমে ডিসেম্বর থেকে মার্চ–এপ্রিল মাসে জাল ফেলা বন্ধ থাকবে।
এছাড়াও বরিশালের হিজলা উপজেলার মাসকাটা, হরিনাথপুর, ধুলখোলা এবং মেহেন্দিগঞ্জের ভাসানচর পয়েন্ট এলাকার মেঘনার শাখা নদী, হিজলা উপজেলার ধর্মগঞ্জ ও নয়া ভাঙনী নদীসহ মেহেন্দিগঞ্জের লতা নদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ প্রতিদিন স্রোতের বিপরীতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলতে সক্ষম। জীবনচক্রে ইলিশ স্বাদু পানি থেকে নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। উপকূলের ৭ হাজার ৩৪৩ বর্গকিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মুক্তভাবে ভাসমান ডিম ছাড়ার পরে তা থেকে ফুটে বের হওয়া ইলিশের লার্ভা স্বাদু পানি ও নোনা পানির নার্সারি ক্ষেত্রসমূহে বিচরণ করে খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে।
নার্সারি ক্ষেত্রসমূহে ৭ থেকে ১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়িয়ে জাটকা হিসেবে সমুদ্রে চলে যায় পরিপক্বতা অর্জনে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে সমুদ্রে যাওয়ার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় ইলিশ পোনা–জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।








