,

মাদকের আখড়া ভাঙতে জেনেভা ক্যাম্পে বসছে পুলিশের স্থায়ী চেকপোস্ট

শাওন বণিক, স্টাফ রিপোর্টার

চেকপোস্টে তল্লাশির মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হবে জেনেভা ক্যাম্পে!

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারের জেরে হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের লাগাম টানতে বসানো হচ্ছে পুলিশের স্থায়ী চেকপোস্ট। ক্যাম্পে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগতদের তল্লাশি ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা রোডম্যাপ হাতে নিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেড় দশক ধরে মাদকের আগ্রাসনের কারণে মোহাম্মদপুরের বিষফোঁড়ায় রূপ নিয়েছে জেনেভা ক্যাম্প। জেনেভা ক্যাম্পের চারটি মাদক কারবারি গ্রুপের স্পট নিয়ন্ত্রণ-দ্বন্দ্বের জেরে হত্যা এখন নিয়মিত ঘটনা। জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লুট হওয়া থানার অস্ত্রে সংঘর্ষ এখন লাগামছাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিস্ফোরক দ্রব্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই মাদকের স্রোত।

মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে জেনেভা ক্যাম্পে অন্তত ৪০টি মাদক ও অস্ত্রবিরোধী অভিযান হয়েছে। ৯টি হত্যা মামলাসহ শতাধিক মাদক মামলা হয়েছে। গত ১০ মাসে অন্তত মাদক ও হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি।

এদিকে, অবাক করা বিষয় হলেও জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দারা ঠিক কত, তার সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। কোনো সংস্থাই বলতে পারছে না কারা বৈধ অথবা কারা অবৈধ। সঠিক হিসাব না থাকায় সহজেই অপরাধীরা ক্যাম্পে আত্মগোপনে থেকে বছরের পর বছর অপরাধ করে যাচ্ছে।

এবার বৈধ নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত ও অবৈধ কেউ যেন ক্যাম্পে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে পুলিশ। অবৈধ প্রবেশ ও মাদকের লাগাম টানতে পুলিশের ভিন্ন কৌশলের অংশ হিসেবেই ক্যাম্পের প্রবেশপথে বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজানের তত্ত্বাবধানে, মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানার নেতৃত্বে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অত্যাধুনিক একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনসহ সব স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিবর্তন ও ক্যাম্পকে ঘিরে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা অপরাধের লাগাম টানার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটারের জেনেভা ক্যাম্পকে ৯টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টি গলি। জেনেভা ক্যাম্পের প্রধান প্রবেশপথ ৪টি। এই ৩৬ গলির ৩২টি দিয়ে সহজেই ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করা যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবরে সটকে পড়ে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে ৯টি ব্লকের নিয়ন্ত্রণ বড় চারটি মাদক কারবারি গ্রুপের হাতে। তারা হলো—চুয়া সেলিম, ইমতিয়াজ, ভূইয়া সোহেল ও আলতাফ ওরফে বম। যদিও বর্তমানে আলোচনায় দুটি গ্রুপ। ক্যাম্পের মাদক কারবারিদের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ভূইয়া সোহেল ও তার ভাই টুনটুনের হাতে। হেরোইন ও ইয়াবার বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে জেনেভা ক্যাম্পের স্বঘোষিত মুকুটহীন মাদক সম্রাট বনে গেছে ভূইয়া সোহেল।

অপর পক্ষে চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, গলাকাটা মনু ও বিখ্যাত বোবা বিরিয়ানির মালিক আলতাফ ওরফে বম ও তার ছেলে ইরফান ওরফে দাম্মাক। সৈয়দপুর থেকে জেনেভা ক্যাম্পে আসা পরিবারগুলোর মধ্যে একটি আলতাফের পরিবার। এ গোষ্ঠীর সবাই মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

এছাড়াও শীর্ষ ব্যবসায়ীর ছায়াতলে আছেন আরও কয়েকজন মাঝারি পর্যায়ের মাদক কারবারি। এই সব কারবারিদের হয়ে জেনেভা ক্যাম্পের প্রতিটি অলিগলিতে অন্তত ৫০০ মাদক বিক্রেতা রয়েছে, যারা দিন-রাত প্রকাশ্যে হাকডাক দিয়ে মাদক বিক্রি করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বর্তমানে আলোচনায় থাকা ভূইয়া সোহেল ও তার প্রতিপক্ষ (চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, মনু, ইরফান)—এই দুই গ্রুপের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অর্ধশতবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার সর্বশেষ নাম জাহিদ ওরফে মোওগা জাহিদ।

তেজগাঁও বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাদকের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে জেনেভা ক্যাম্পের চারপাশে থাকা হুমায়ুন রোড, বাবর রোড, গজনবী রোডের সাতটি পয়েন্টে স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে। এই চেকপোস্ট দিয়ে পায়ে হেঁটে বৈধ বাসিন্দারা ক্যাম্পে প্রবেশ করবেন। যাতায়াতের সময় প্রত্যেককেই মুখোমুখি হতে হবে তল্লাশির। এছাড়া কয়েকটি সড়কে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ফলে কেউ চাইলেই গাড়ি ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করতে পারবে না। এমনকি জরুরি গাড়ি ছাড়া ক্যাম্পের ভেতরে কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হবে না।

তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক, যারা ক্যাম্পের কেউ না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জেনেভা ক্যাম্পে এসে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই অন্য এলাকায় অপরাধ করে ক্যাম্পে আত্মগোপন করে থাকেন। এই সব বাসিন্দারাও ক্যাম্পের নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে বহিরাগতদের বড় একটি অংশ ক্যাম্পের মাদক সরবরাহের কাজের সঙ্গে জড়িত।

মাদক ও ঘনবসতি ছাড়াও ক্যাম্পের যত্রতত্র স্থাপনা শঙ্কার কারণ। ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে শত শত মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। কারণ স্থান সংকটের কারণে ক্যাম্পের বাসিন্দারা যে যেভাবে পেরেছে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। এক্ষেত্রে নির্মাণের কোনো নীতিমালা মানা হয়নি। তাই সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়া নতুন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে ভবিষ্যতে ভবনের কাজের নীতিমালা চালু করা হবে।

ক্যাম্প ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পাকিস্তানি নাগরিক বলে মৌলিক অধিকার—খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়—সবকিছুতেই তাদের কষ্ট। পাকিস্তানি বিহারি বলে তাদের মানুষই মনে করা হচ্ছে না। এরপর যদি বলা হয় যে অপরাধ ছেড়ে ভালো হও—এটা তো কখনো সম্ভব না। এভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অধিকাংশ মানুষ অপরাধ করে বাধ্য হয়ে। অবাক হলেও সত্য, জেনেভা ক্যাম্পের অধিকাংশ মাদক কারবারি জন্মসূত্রে মাদক কারবারি। এখানে এমন একটা পরিবেশ মাদক কারবারে বাধ্য করে। তাদের আমরা খারাপ বলি, অথচ কক্সবাজারে বসে যারা মাদকের বড় বড় কারবার করছে, তাদের আমরা কিছুই বলি না, বলতে পারি না। অথচ তারাই দেশের ভেতরে মাদক সরবরাহ দেয়। তাই আমরা জেনেভা ক্যাম্প ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সিটি করপোরেশনসহ সকলের সহযোগিতায় ক্যাম্পে মাদকের রমরমা কারবার বন্ধ করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, আমরা একটা রোডম্যাপ তৈরি করেছি। আগামী রোববার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে আমরা সরেজমিন পরিদর্শনে যাব। সিটি করপোরেশনসহ সকলের সহযোগিতায় আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।

ক্যাম্পের প্রবেশপথে চেকপোস্টের বিষয়ে তিনি বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের চার পাশেই সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সড়ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাইলে আমরা সড়ক বন্ধ করতে পারব না। কিছু সড়কে আমরা যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করব। পাশাপাশি ক্যাম্পে যাতায়াতের প্রতিটি পথে চেকপোস্ট বসানো হবে। এছাড়া অবৈধ বাসিন্দাদের ক্যাম্প ছাড়তে বলা হবে। পাশাপাশি ক্যাম্পের বাসিন্দা কিন্তু বাইরে থাকে—এমন লোকজনকে ক্যাম্পে ফেরানো হবে। এছাড়াও ক্যাম্পের ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করব।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকরা মোহাম্মদপুরের স্কুল, মসজিদ ও মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকার মানবিক কারণে মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে অস্থায়ী ক্যাম্পে ৩০ হাজার নাগরিককে আশ্রয় দেয়। এছাড়া আইসিআরসি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ৬৬টি ক্যাম্প স্থাপন করে। ১৯৭৩ সালে আইসিআরসি থেকে ক্যাম্পের দায়িত্ব নেয় বিডিআরএস। ১৯৭৫ সালে ক্যাম্পের দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসে। তবে গত ৫০ বছরে নতুন ৩টি প্রজন্ম তৈরি হলেও বৃদ্ধি পায়নি বাসস্থান, বাড়েনি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। বর্তমান প্রজন্ম বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তারা এখনো রয়েছেন নাগরিক সুবিধার বাইরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ