স্টাফ রিপোর্টার : ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।’-কথাগুলো বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাথে বলেছেন, রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে পুরো বিশ্বকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবনির্মিত আটতলা ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি ‘সারা বিশ্বে বঙ্গবন্ধু কর্ণার’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। গত বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সেরা কূটনীতিক বঙ্গবন্ধু পদক’ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু রাজনৈতিক না, আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পৃথিবীটা এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ। আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের সেভাবেই কাজ করতে হবে যে, সকলের সঙ্গেই মিলে আমরা কাজ করব, যেন মানুষের উন্নতি হয়। আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। সবসময় আমরা শান্তি চাই। জাতির পিতা আমাদের শিখিয়েছেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” সেই নীতিটা যথাযথভাবে আমি মেনে চলি, আমাদের রাষ্ট্র মেনে চলে।’
পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন ও ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি ‘সেরা কূটনীতিক বঙ্গবন্ধু পদক’ পেয়েছেন।সুলতানা লায়লা হোসেন রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে কয়েক হাজার বাংলাদেশি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র ইউক্রেন ছেড়ে পোল্যান্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে অসাধারণ অবদান রাখায় এবং ইতো নাওকি ঢাকা-টোকিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ‘বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধু কর্নার’ নামের একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং বিদেশের সব বাংলাদেশ মিশনের জন্য অভিন্ন ওয়েবসাইট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনসহ দুই রাষ্ট্রদূত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে সারা বিশ্বের মানুষকে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারটা কোনোভাবেই উচিত নয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের মানুষকে এভাবে শাস্তি দেয়া থেকে সরে আসতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহবানও জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা আশা করি যে, একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে বিশ্বের মানুষকে শাস্তি দেয়া, এখান থেকে সরে আসাটাই বোধহয় বাঞ্ছনীয় এবং সেটা সকলেই চাইবে। আমি এটা মনে করি।’
প্রধানমন্ত্র বলেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাত থেকে অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আবারও বিশ্ব অর্থনীতিকে ও বিশ্বের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
তিনি বলেন, ‘তার ওপর আমেরিকা যে স্যাংশন (অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা) দিয়েছে, এই স্যাংশন দেয়ার ফলে আমাদের পণ্য প্রাপ্তিতে বা যেগুলো আমরা আমদানি করি, সেখানে বিরাট বাধা আসছে। শুধু তাই নয়, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে এবং আমরা কোথায় আমাদের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পাব, সেই প্রাপ্তির ক্ষেত্রটাও সংকুচিত হয়ে গেছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘এই প্রভাবটা শুধু বাংলাদেশ না, আমি মনে করি এটা আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে সারা বিশ্বব্যাপী এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মানুষ কিন্তু কষ্ট ভোগ করছে।’
তিনি বলেন, ‘এটা আসলে উন্নত দেশগুলোর বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত বা আমেরিকার এটা বিবেচনা করা উচিত, তারা যে স্যাংশন দিচ্ছে, তাতে যে তাদের দেশের লোকও কষ্ট পাচ্ছে, সেদিকেও কিন্তু তাদের দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই স্যাংশন যাদের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন, তাদের আপনারা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তারা আসলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? তার থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ হচ্ছে সব দেশে। সেই উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, সকল দেশের মানুষ কিন্তু বা যারা নিম্ন আয়ের দেশ, সব দেশগুলো কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, স্যাংশন দিয়ে কোনো দেশ বা জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সেটা নিশ্চয়ই এখন দেখতে পাচ্ছেন। তার প্রভাবটা নিজেদের ওপর এসেও পড়ে। কাজেই এই স্যাংশন তুলে দেয়া এবং পণ্য পরিবহন আর যুদ্ধ যারা করতে থাকেন, কিন্তু পণ্য পরিবহন বা আমদানি-রপ্তানিটা যেন সহজভাবে হয় আর সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘সেখানে সমস্যায় পড়ে গেছে অনেক উন্নত দেশও। আজকে আমরা যেটা খবর পাই বিভিন্ন দেশ থেকে, আমাদের অনেক লোক সেখানে বসবাস করে, প্রত্যেকের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। আর আমার দেশে, আমি সবসময় চেষ্টা করছি, আমাদের যে মাটি, মানুষ আছে, আমরা উৎপাদন বাড়াব। আমাদের খাদ্যটা যেন আমরা নিজেরাই উৎপাদন করে চলতে পারি, সে ব্যবস্থাটাও করব, সঙ্গে যদি কাউকে সাহায্য করতে পারি, সেটাও করব।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘উৎপাদন বাড়াতে গেলে আমাদের সার প্রয়োজন, আমাদের ডিজেল প্রয়োজন, আমাদের বিভিন্ন উপকরণ প্রয়োজন। সেটা আমরা পাচ্ছি না। কাজেই এভাবে মানুষকে কষ্ট দেয়ার কী অর্থ থাকতে পারে, আমি ঠিক জানি না।’ এভাবে অবরোধ আরোপ করে সমগ্র বিশ্বের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গেও তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘একটা বিষয় আমি একটু না বললে নয়, সেটা হচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু। আমরা মানবিক কারণে এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তিনটা বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। আমাদের জন্য আসলে এটা একটা বিরাট বোঝা। একে তো এই করোনা ভাইরাস, তার ওপরে যুদ্ধ—এই পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো যেখানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হিমশিম খাচ্ছে—সেখানে আমাদের এই সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের উপরে আরেকটা বোঝা টানা যে কত কষ্টকর তা সকলের উপলব্ধি করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশগুলো যদি আর একটু সক্রিয় হয়ে এই রোহিঙ্গারা যেন তাদের নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে সেটা দেখবেন। তাদের ছেলে-মেয়েরা যেন তাদের নিজের দেশে মানুষ হতে পারে, তারা একটা ভালো পরিবেশে চলে যেতে পারে, এভাবে ক্যাম্পের জীবনযাপন যেন না করতে হয়। তাদেরও তো একটা মানবাধিকার আছে। কাজেই সে ব্যাপারে সকলেই একটু সক্রিয় হবেন সেটাই আমি আশা করি।’








