মিথুন আশরাফ – বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনে জাতীয় তদন্ত কমিশন এ বছরেই গঠন করা হচ্ছে। বুধবার সংসদে তদন্ত কমিশন গঠন করার প্রস্তাব ওঠে। এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সবশেষ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।
পনেরো আগস্ট হত্যাকান্ডের তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ড নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করার প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে বর্ষীয়ান সংসদ সদস্যগণ বক্তব্য রাখেন। প্রস্তাব সমর্থন করে মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, আকম মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জিএম কাদের, কাজী ফিরোজ রশিদ, রাশেদ খান মেনন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।
সংসদে উত্থাপন করা প্রস্তাবটি হচ্ছে, ‘যে ঘৃণ্য খুনিচক্র ও চক্রান্তকারী গোষ্ঠী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানাচ্ছি। কিন্তু চক্রান্তকারীদের প্রেতাত্মারা এখনো ক্ষান্ত হয়নি। পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে দিতে আজও তারা ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তকে সফল হতে দেওয়া যায় না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিহাসের পাদদেশে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা, বাঙালির মহত্তম ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব শহীদকে বিনম্র চিত্তে ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। সব চক্রান্ত র্ব্য করে দেওয়ার শপ গ্রহণ করছি। ২০২২-এর আগস্ট মাসে একাদশ জাতীয় সংসদের ঊনবিংশতম অধিবেশনে এই হোক দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা।’
এরপর প্রধানমন্ত্রী আবেগআপ্লুত হয়ে বলেন, ১৫ আগস্ট শুধু আমাদের পরিবারের ক্ষতি নয়, একটি দেশ ও জাতির ক্ষতি। বাবাকে আন্তর্জাতিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু কোন বাঙালি তাঁকে (বঙ্গবন্ধু) মারতে পারে এটা তিনি কখনও বিশ্বাসই করতে পারেননি। যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা ১৫ আগস্টের খুনি, তাদের স্বজন ও কিছু অপরাধী দেশের বিরুদ্ধে এখনও ষড়যন্ত্র করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এইটুকু বলবো যে আমরা আমাদের দেশের মানুষের কল্যাণটাই আমাদের কাছে সব থেকে বড়। মানুষের কষ্ট হলে সেটা অন্তত আমার মনে ব্যথা লাগে কারণ আমার বাবা তো এদেশের মানুষের জন্যই তার জীবনটা উৎসর্গ করেছেন। কাজেই আমি মনে করি যে আপনাদেরও সকলের সহযোগিতা দরকার। খালি কতগুলো অসত্য তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না। এটাই আমার কথা। গৃহহীনদের ঘড় দেওয়া হয়েছে। যখন তারা ঘর পেয়ে খুশি হয়েছে, আমার বুকটা ভরে গেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৫ আগস্টের ঘটনায় জিয়া, মুশতাক নেপথ্যে ভুমিকা পালন করেছে। জেনারেলরাও বিষয়টি জানতেন। তা না হলে খুনিরা কিভাবে বিদেশ চলে যান। তাদেরকে বিদেশের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়। তাদের কোন প্রতিহত করা হয়নি। এ থেকেই বোঝা যায়, ঐ সময়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উচ্চপদে ছিলেন তারাও যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক পর্যায়ে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের মুখোশ উন্মোচনের জন্য আইন করা হবে।’
মানবাধিকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যেসব দেশ মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে, আমাদের ওপর স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দেয়, তারা তো খুনিদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। তারাই আবার বাংলাদেশকে মানবাধিকারের ছবক দেয়। আমার বাবা-মা ও ভাইদের যারা হত্যা করেছে সেই খুনিদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে আজ মানবাধিকারের কথা বলা বড় বড় দেশগুলো।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পঁচাত্তরের খুনি চক্রান্তকারীদের প্রেতাত্মারা এখনও ক্ষান্ত হয়নি। আজও তারা ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব চক্রান্ত ব্যর্থ করার শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদে সাধারণ প্রস্তাব উঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কোনও প্রতিহিংসামূলক বা প্রতিশোধের জন্য নয়, এই কমিশনের দায়িত্ব হবে, নতুন প্রজন্মকে বেইমানদের চিহ্নিত করে যাওয়া। নতুন প্রজন্ম, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা দায়বদ্ধ থাকবো, আমরা যদি এসব বেইমান, যারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তাদেরকে নতুন প্রজন্মের কাছে চিহ্নিত করে না দিয়ে যেতে পারি। ২০৪১ সালের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ। সেই উন্নত দেশ তৈরি করতে হলে, উন্নত দেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সেই বেইমানদের পরিচয় উদঘাটন করতে হবে। না হলে সেই দিনের প্রজন্ম আমাদের দোষী করবে। বলবে, আমরা তো তাদের পরিচয় দিয়ে যাইনি, তারা কীভাবে ব্যবস্থা করবে।’








