স্টাফ রিপোর্টার – দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্নের ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৮ম বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সেতু’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পিরোজপুরের কচা নদীর ওপর নির্মিত সেতু প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ের চামেলী হল প্রান্ত থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আজ রাত ১২টা ১ মিনিটে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
এসময় সেতুর দুই প্রান্তে পিরোজপুর সদর উপজেলার কুমিরমারা ও কাউখালী উপজেলার বেকুটিয়ায় দুটি প্যান্ডেল করে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী এবং পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শ ম রেজাউল করিম। এতে যোগ দেন সেতুর দুই প্রান্তের হাজারও মানুষ।
সেতুটি সকাল সাড়ে ১০টায় উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেকুটিয়ায় কঁচা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি-কোটি মানুষের আরও একটি স্বপ্ন পুরণ হতে যাচ্ছে। নদীর পশ্চিম এবং পূর্বপাড়ে দু’টি সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরাসরি পিরোজপুরে গিয়ে সেতু উদ্বোধন করতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য আসতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সেতু নির্মাণে সহযোগিতা করায় চীনকে ধন্যবাদ জানান। সেতু উদ্বোধনের ফলে শেষ হয়েছে দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপারের ভোগান্তি। পিরোজপুর সদর উপজেলার সঙ্গে ৪টি উপজেলার যোগাযোগে আর থাকবে না সময় অপচয়ের বাধা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সবসময় অবহেলিত। তাই তাদের অবস্থার উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করেছি। পদ্মা সেতুসহ দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করেছি। কঁচা নদীতে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব সেতু উদ্বোধনের পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে আর কোনো বাধা থাকছে না। পিরোজপুরে প্রচুর পেয়ারা হয়। আমরা এখন থেকে ঢাকা বসেই খুব দ্রুত এই জেলার মজার পেয়ারা খেতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই অঞ্চলের এক ইঞ্চি জমিও যেনও অনাবাদি না থাকে। সারাদেশের মানুষকে পানি, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। সারা বিশ্বে মন্দা দেখা দিয়েছে, আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। দক্ষিণাঞ্চরের মানুষকে উৎপাদনমুখী হতে হবে। আমরা লবণাক্ত জমিতে ধান রোপণের জাতও উদ্ভাবন করেছি। আমরা আমাদের খাবার নিজেরাই উৎপাদন করবো। আগামীতে দেশকে আরও উন্নত সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এসময় রাশিয়া ইউক্রেনের মতো বিশ্ব আর কোনো যুদ্ধ চায় না জানিয়ে শেখ হাসিনা তুলে ধরেন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে আবারও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানান তিনি।
২০১৩ সালের ১৯ মার্চ পিরোজপুরের এক জনসভায় কঁচা নদীর উপর সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর বাংলাদেশ-চীন ৮ম মৈত্রী সেতু র নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন তিনি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ৮৯৪ দশমিক শূন্য আট কোটি টাকা ব্যয় করে এক হাজার ৪৯৩ মিটার দৈর্ঘের এবং ১৩ দশমিক ৪০ মিটার প্রস্থের এই পিসি বক্স গার্ডার সেতুটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার এই সেতুটি নির্মাণে ৬৫৪ দশমিক ৮০ কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য প্রদান করেছে এবং বাংলাদেশ সরকার ব্যায় করেছে ২৩৯ দশমিক ৮০ কোটি টাকা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ মাস আগেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজ শেষ করে সেতু বিভাগের কাছে গত মাসের ৭ তারিখ হস্তান্তর করেন। সেতুর পূর্ব প্রান্তে নদীর তীরে ২২০ মিটার দীর্ঘ ও ৫৫ মিটার প্রস্থের বিনোদন এলাকা উন্নয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব প্রান্তে এপ্রোচ সড়ক সংলগ্ন ৬০ মিটার দীর্ঘ ও পাঁচ মিটার প্রস্থের বিটুমিনাস সড়ক, এপ্রোচ সড়কের নিচে ৬০ মিটার দীর্ঘ ও পাঁচ মিটার প্রস্থের কংক্রিট সড়ক এবং পশ্চিম প্রান্তে ১২০ মিটার দীর্ঘ এবং তিন দশমিক ৫০ মিটার প্রস্থের কংক্রিট সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ২২০ মিটার নদী শাসনের কাজ করা হয়েছে। এ সেতু প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাসুদ মাহমুদ সুজন জানান, চীনের মেজর ব্রিজ রিকনাইসেন্স এবং ডিজাইন ইন্সটিটিউট কোম্পানি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে চায়না রেইল ওয়াচ ১৭ ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এই সেতুটি নির্মাণ করে।
পিরোজপুরের চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি গোলাম মাওলা নকীব প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই সেতুটি উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও একটি নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হবে। নকীব বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত সাগরকন্যা কুয়াকাটার সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় এ অঞ্চল দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে, আর এর প্রাণকেন্দ্র হবে পিরোজপুর। বিভাগীয় শহর বরিশালের সঙ্গে বিভাগীয় শহর ও শিল্পনগরী খুলনার সড়ক যোগাযোগে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রার সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মংলা ও সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রব্বানী ফিরোজ বলেন, এই বঙ্গমাতা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে। পটুয়াখালীর শেখ হাসিনা সেনানিবাসের সঙ্গে যশোর সেনানিবাসের সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপিত হবে। নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অমূল্য রঞ্জন হালদার বলেন, আমাদের বিভাগীয় শহর বরিশালে যেতে এখন আর ফেরীর অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না।








