মিথুন আশরাফ – আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুঁশিয়ার করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের গায়ে হাত দিলে তাদের রক্ষা নেই। তিনি বলেন, রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ করলে কেউ রক্ষা নেই। স্বাধীনতার পর থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, ভবিষ্যতেও পাবে না। সবারই বিচার করা হবে। বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে ‘অগ্নি সন্ত্রাসের আর্তনাদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে একথা বলেন সরকারপ্রধান। রবিবার রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৩-১৪ সালে দেশের ৩ হাজার ৬০০ মানুষ বিএনপি-জামায়াতের হামলার শিকার হয়েছে। বিএনপির বিচার করতে হচ্ছে না। প্রকৃতিই তাদের বিচার করছে। আগুন সন্ত্রাস মানবতাবিরোধী অপরাধ। এসব অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, বিচার হচ্ছে। এমনকি যারা হুকুম দিয়েছে সেই হুকুমের আসামিদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, বিএনপি আবারও সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের পথ বেছে নিলে বরদাস্ত করা হবে না। সুস্থ রাজনীতিতে সরকারের আপত্তি নেই। তবে সাধারণ মানুষের ওপর কেউ চড়াও হলে তা সহ্য করা হবে না। আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের শান্তি, কল্যান ও উন্নয়ন চায়।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ যেন আর আগুন সন্ত্রাস ঘটাতে না পারে। দল, মত, নির্বশেষে যেই হোক, এ দেশের প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে ২০১৩-২০১৪ সালে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। আওয়ামী লীগ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি দেখেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে এসব ঘটনায় সেসময় নিহতদের পরিবার ও আহতদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শোনেন তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। আক্রান্ত মানুষের আহাজারিতে চোখ ভিজে আসে বঙ্গবন্ধুকন্যার।
যারা ধ্বাংসাত্মক কাজ করতে পারে ও কষ্ট দিতে পারে, তাদের পাশে মানুষ কীভাবে দাঁড়ায় সেই প্রশ্ন করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমি জানি না মানুষ আবার এদের পাশে কীভাবে দাঁড়ায়? কীভাবে সমর্থন করে?
বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা চান না বলে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা শান্তি চাই। দেশের উন্নতি ও মানুষের কল্যাণ চাই। দেশের প্রত্যেকটা মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই অধিকার সংরক্ষণ করার চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।
সরকার উৎখাতের নামে ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে অগ্নি সন্ত্রাস হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, কীভাবে মানুষ মারে? একটা গাড়িতে যাচ্ছে জীবন্ত মানুষগুলো। সেখানে আগুন ধরিয়ে মানুষকে হত্যা করা। কীভাবে মানুষ পারে মানুষের ক্ষতি করতে? এটাই নাকি আন্দোলন! এই আন্দোলনতো আমরা কখনও দেখিনি।
স্কুল জীবন থেকে আন্দোলন করেছেন বলে জানান শেখ হাসিনা। সামরিক শাসক আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের রাজপথে থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তো এই কথা কখনও স্বপ্নেও ভাবি নাই। পেট্রল বোমা দিয়ে অথবা অগ্নি সন্ত্রাস করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। সেটা আন্দোলন!

সরকারপ্রধান বলেন, বিএনপি ঘোষণা দিল অবরোধ এবং হরতাল। কিন্তু কাজ হলো মানুষকে হত্যা করা। আজ এখানে যারা উপস্থিত তারা তো সামান্য কয়েকজন। ২০১৩ সালের তিন হাজার ৬০০শ’ জমের মতো মানুষকে পেট্রল বোমা মেরে আহত করেছে। ২০১৪ ও ১৫ সালেও করেছে। একইভাবে গাড়ি পুড়িয়ে মানুষের জীবনজীবিকা শেষ করে দিয়েছিল। এটা কী রকম আন্দোলন। সেটাও জানি না।
আন্দোলন, মানুষের অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষকেই নিয়েই তো আন্দোলন করতে হয় বলে জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, কিন্তু তারা আক্রমণ চালিয়েছে।
২০১৩ সালে আন্দোলনের নামে বিএনপি মানুষ খুন করা শুরু করেছিল বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রায় ৫শ’ জন মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছে এবং সাড়ে তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছিল বলে জানান তিনি। অগ্নি সন্ত্রাসে নিহতদের স্বজন ও আহতদের বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের কন্না, যন্ত্রণা, ও বেদনা আজ দেখেছেন। আমি স্বজন হারা এক দিনে বাবা, মা, ভাই সব হারিয়েছিলাম। এদের কষ্টাটা আমি উপলব্ধি করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি তাদের পাশে দাঁড়াতে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। জীবনজীবিকার ব্যবস্থা যতটুকু পারি করেছি। কিন্তু যে মানুষগুলো আপনজন হারিয়েছে। তাদের ব্যথা, কষ্ট ও বেদনা তো দূর করা সম্ভব না। আগুনে পুড়ে অনেকের স্বপ্ন-আঙ্খাক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে জানান তিনি।
দেশবাসীর উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই দুঃসময়ের কথা যেন কেউ ভুলে না যায়। আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার পর থেকে দেশে স্থিতিশীলতা এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি যতটুকু সম্ভব আমরা করে যাচ্ছি। যেটুকু কাজ করে যাচ্ছি মানবকল্যাণে। কিন্তু তারই মাঝে এই ধরনের আঘাত চরম মানবাধিকার লঙ্গন করা।
অগ্নিসন্ত্রাসী ও তার মদতদাতাতের বিচার এমনিই হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, বিচার বোধহয় আল্লার তরফ থেকেই হবে। হয়তো প্রত্যেক মামলার বিচার চলছে না। কিন্তু যারা অগ্নিসন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে। বিচারের কাজ চলছে। অনেকই শাস্তি পাচ্ছে। ভবিষ্যতেও পাবে। কিন্তু যারা হুকুমদাত্রী বা হুকুমদাতা তাদের কথাও আপনারা ভেবে দেখেন।
অগ্নিসন্ত্রাসে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আহতের জন্য সাধ্যমতো কাজ করে যাবেন বলেও জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এটাই আমার দায়িত্ব। কত যে লাশ টানতে হয়েছে। কত মানুষকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। কত মানুষের যে চিকিৎসা দিতে হয়েছে তার শেষ নাই।
স্বজনহারা মানুষের পাশে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও থাকবেন বলে অঙ্গীকার করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, আমাকে দেখেন! আমরা দুটি বোন একই দিনে সব হারালাম। দেশে আসতে পারলাম না। রিফিউজি হিসেবে বিদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকতে হলো। অর্থ নেই, সম্পদ নেই, কিচ্ছু নেই। আমাদের ওভাবেই জীবন কাটাতে হয়েছে।
নিজের ওপরও বিএনপির সন্ত্রাসী আঘাত বারবার এসেছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে গেছি, একবার না বারবার আঘাত এসেছে। জানি না, আল্লাহর কী ইচ্ছা! বারবার বাঁচিয়েছে আমার পার্টি। আওয়ামী লীগের লোকজন আমাকে মানবঢাল রচনা করে বাঁচিয়েছে। আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। তারপরেও আমি কাজ করে যাচ্ছি; কাজ করে যাব। আমি আপনাদের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাই। আমি আছি আপনাদের পাশে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে কোনো ফরমাল বক্তব্য দেয়ার কিছু নেই। শুধু মানুষের কান্না, মানুষের যন্ত্রণা, মানুষের বেদনা—সেটাই আপনারা দেখেছেন। আমি একজন স্বজনহারা। আমি একই দিনে বাবা-মা-ভাই সব হারিয়েছিলাম। তাই আমি এদের কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি মানুষের জন্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার দেশের মানুষ খেয়ে-পরে ভালো থাকবে, শান্তিতে থাকবে, উন্নত জীবন পাবে, যেটা আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণ করা ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি কাজ করে যাচ্ছিলাম। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যা যা করার চেষ্টা করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, দল-মত নির্বিশেষে যেই হোক এদেশের প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার আছে। প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে নিজের জীবন জীবিকা করার অধিকার আছে। প্রতিটি মানুষের সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার আছে। সেই অধিকার সংরক্ষণ করাই আমাদের দায়িত্ব, আমরা সেটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। আজকে এদের বিচার হচ্ছে। বিচার হবেই, বিচার এটা বোধহয় আল্লাহর তরফ থেকেই হবে। যারা এ ধরনের অগ্নি-সন্ত্রাসের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, বিচার হচ্ছে, অনেকে শাস্তি পাচ্ছে, ভবিষ্যতেও পাবে। কিন্তু যারা হুকুম দাতা তাদের কথা আপনারা ভেবে দেখেন আর এরাই আবার জানি না মানুষ কীভাবে এদের পাশে দাঁড়ায়, কীভাবে সমর্থন করে যারা এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে, মানুষকে কষ্ট দিতে পারে।
সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন আহত, নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিক আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর সদস্যের পরিবারের সদস্যরা। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।








