স্টাফ রিপোর্টার – বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী সুমিত্রা সেন আর নেই। চলে গেলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। অনেক দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে ভীষণ ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলেন সুমিত্রা সেন। এর ফলে জ্বরের সঙ্গে বুকে সর্দি বসে অবস্থার অবনতি হয়। এর পর তাকে ২১ ডিসেম্বরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ব্রঙ্কো-নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। সোমবার তাকে ছুটি করিয়ে বাড়ি আনা হয়। মঙ্গলবার সকালে গায়িকা শ্রাবণী সেন তার মায়ের প্রয়াণের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান। তিনি লেখেন – আজ মা ভোরে চলে গেল।
আগামী মার্চ মাসেই তিনি ৯০ বছর পূর্ণ করতেন। তার আগেই চলে গেলেন। সোমবার শ্রাবণী সেন সংবাদমাধ্যমকে তার মায়ের স্বাস্থ্যের বিষয়ে বলেন, বয়সটা তো একটা কারণ। ভালো নেই মা। মোটামুটি আছেন। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেই তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। সুমিত্রা কন্যা ইন্দ্রাণীও একই কথা জানিয়ে ছিলেন সংবাদমাধ্যমকে। পরিবারের সঙ্গে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে বাড়ি আনা হয় সোমবার। এদিকে রাত কাটতে না কাটতেই চলে গেলেন গায়িকা।
রবীন্দ্র সঙ্গীতের দুনিয়ার অতি পরিচিত নাম সুমিত্রা সেন। তার দুই মেয়ে – ইন্দ্রাণী সেন ও শ্রাবণী সেনও বাংলার সঙ্গীত জগতে ছাপ ফেলেছেন। মায়ের পথে হেঁটে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চাই করে গিয়েছেন ছোট মেয়ে শ্রাবণী সেন, ইন্দ্রাণী সেন অবশ্য সব ধরনের গানেই নিয়েই ছাপ রেখেছেন। নিজ বাসস্থানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন সুমিত্রা সেন।
বর্ষীয়ান এই শিল্পীর প্রয়াণে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমবেদনা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সুমিত্রা সেনের প্রয়াণে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। রবীন্দ্রসঙ্গীতের অগ্রগণ্য শিল্পী সুমিত্রা সেন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিজস্ব গায়কিতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। প্রশিক্ষক হিসাবে তিনি অগণিত গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রী রেখে গিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে ‘সঙ্গীত মহাসম্মান’ -এ সম্মানিত করে। সুমিত্রা সেনের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীত জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হল। আমি সুমিত্রাদির দুই কন্যা ইন্দ্রাণী ও শ্রাবণী এবং সুমিত্রাদির পরিবার-পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমসাময়িক শিল্পী সুমিত্রা সেন। তার জন্ম ১৯৩৩ সালে, কলকাতায়। ১৯৫১ সালে দুটি নজরুলগীতি রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে শিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। তখনও বিয়ে হয়নি, উপাধি ছিল দাশগুপ্ত।
রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ছাড়াও পল্লীগান ও আধুনিক গানের রেকর্ডও রয়েছে সুমিত্রা সেনের। সিনেমার গানেও প্লে-ব্যাক করেছেন। ১৯৬০ সালে ‘শুন বরনারী’ সিনেমায় তার প্রথম গাওয়া। প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দোপাধ্যায় পরিচালিত শ্যামা’, ‘শাপমোচন’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, ‘বর্ষামঙ্গল’, ‘বসন্ত’ বা ‘মায়ার খেলা’র মত গীতিনাট্যে সুমিত্রা সেনের কণ্ঠ জনপ্রিয়তা পায়। উস্তাদ আলি আকবর খান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, রবীন চট্টোপাধ্যায়, ভি বালসারা, তিমির বরণ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মত বহু সংগীত পরিচালকের সঙ্গে সুমিত্রা সেন কাজ করেছেন। পঙ্কজকুমার মল্লিকের পরিচালনায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র গানে (মাগো তব বীণে সংগীত) সুমিত্রা সেনের কণ্ঠ ইতিহাসের অংশ। গানের স্বীকৃতিতে এই শিল্পী পেয়েছিলেন ‘সঙ্গীত-নাটক অ্যাকাডেমি’সহ নানা পুরস্কার।








