মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পাতাল ট্রেনের যুগে ঢুকছে বাংলাদেশ

পাতাল ট্রেনের যুগে ঢুকছে বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার – আর মাত্র মাঝখানে একদিন। এরপরই বৃহস্পতিবার পাতাল ট্রেনের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মেট্রোরেলের পর পাতাল ট্রেন (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) ২০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মিত হবে। এতে ব্যয় হবে ৫২ হাজার কোটি টাকা। উড়াল ট্রেনের পর এবার পাতাল ট্রেনের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজধানীর কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। পূর্বাচল থেকে পিতলগঞ্জ পর্যন্ত হবে উড়াল রেলপথ। বৃহস্পতিবার দেশের প্রথম এই পাতাল ট্রেনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় বেলা ১১টায় এর উদ্বোধন হবে। পাতাল রেল হচ্ছে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-১) প্রকল্পের আওতায়। এটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। দেশে এবার মাটির নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন।

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে ডিএমটিসিএল। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এরমধ্যে জাপানি ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। আর বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে মেটানো হবে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের সভা কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানির এমডি এমএএন সিদ্দিক।

তিনি বলেন, ২ ফেব্রুয়ারি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় প্রধানমন্ত্রী এই কাজের উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে রূপগঞ্জ জমতা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন রাজউকের কমার্শিয়াল প্লট মাঠে সভা হবে। রূপগঞ্জের পিতলগঞ্জ মৌজায় ৮৮ দশমিক ৭১ একর ভূমিতে ডিপো হবে। এখাতে ব্যয় হবে ৬০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বিমানবন্দর রুট ও পূর্বাচল রুটে চলাচলকারী সব মেট্রো ট্রেন এই ডিপোর সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, পিতলগঞ্জে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণ হবে। এর মধ্য দিয়ে পাতাল রেলের নির্মাণ কাজ শুরু হবে। এমআরটি-১ প্রকল্প দুটি অংশে বাস্তবায়িত হবে। একটি অংশ হবে পাতাল ও অপরটি হবে উড়াল। দুটি অংশের মূল ডিপো নির্মাণের কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বুধবার চুক্তি সই হয়েছে।

এম এ এন সিদ্দিক বলেছেন, পাতাল মেট্রোট্রেন (এমআরটি লাইন-১) চালু হলে প্রতিটি ১০০ সেকেন্ড পরপর চলাচল করবে। তিনি বলেন, ঢাকার জনসংখ্যার হিসাব এবং বাস্তবতার নিরিখে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এমআরটি লাইন-৬ আমরা যে কন্ট্রোল সেন্টার থেকে পরিচালনা করছি, সেটা এখন সাড়ে তিন মিনিট পরপর চলতে পারে। এটাকে আমরা কমিয়ে আনতে পারব। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-১ এ ১০০ সেকেন্ড দিয়ে শুরু করব। এটাকে হেডওয়ে বলে। ১০০ সেকেন্ডের মধ্যে একটার পর আরেকটা ট্রেন আসবে, এটি আর কমানোর সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আমরা ছয়টি কোচ দিয়ে এমআরটি লাইন-৬ শুরু করেছি এবং আরও দুটি কোচ সংযোজনের সুযোগ রেখেছি। অর্থাৎ এটি আটটিতে উন্নীত করা যাবে। এমআরটি লাইন-৬ আটটি কোচ দিয়ে চলবে। এখানে কোচ বৃদ্ধির বিষয়টি আর প্রয়োজন হচ্ছে না।

ডিএমটিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আপনারা দেখেছেন এমআরটি লাইন-৬ এর স্টেশনগুলো রাস্তার ওপরে হয়েছে। আর একইভাবে এমআরটি লাইন-১ এর স্টেশনগুলো রাস্তা নিচে হবে। এটা মাটির ওপরে তিনতলা হয়েছে, ওটা মাটির নিচে তিনতলা হবে। জনসাধারণের জন্য ভোগান্তি না হয় সে কথা মাথায় রেখেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার এবং জাইকা এর অর্থায়নে পাতাল ট্রেনের নির্মাণ কাজের জন্য ৯২ দশমিক ৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ দশমিক ৪৩ কোটি টাকা।

পাতাল রেল নির্মাণের সময় আশপাশের ভবনগুলোর কোনও সমস্যা হবে না বলে জানান এম এ এন সিদ্দিক। তিনি বলেন, টিভিএম নামে এক রোবট মেশিনের মাধ্যমে মাটি খোঁড়া হবে, যা শব্দহীন। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবে পাতাল রেলস্টেশনে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর আটটি কোচ দিয়ে আড়াই মিনিট পরপর এক একটি ট্রেন এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াবে। সে হিসেবে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার পর ভাড়া কেমন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নির্মাণ ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয় না। পরিচালনা ব্যয় অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ হয়। ভাড়ার বিষয়টি পরিচালনা ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই ভাগে নির্মাণ করা হবে এই লাইন। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার হবে পাতাল ট্রেন। নতুন বাজার থেকে পূর্বাচলের পিতলগঞ্জ পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার হবে উড়াল রেলপথ। এই দুটি অংশে মোট ২১টি স্টেশন থাকবে বলে জানালেন, সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী।

সড়ক, পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব আরও বলেন, মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণ কাজ হওয়ায় মানুষের ভোগান্তি বেশি হবে না। জাপান ও বাংলাদেশের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ করবে। প্রায় ৫৩ কোটি টাকা ব্যায়ের এই প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ ২০২৬ সালে শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, দ্বিতীয় মেট্রোরেল হবে উড়াল ও পাতাল পথের সমন্বয়ে। দুটি রুটে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ নির্মাণ হবে। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত- এই রুটে মাটির নিচ দিয়ে চলবে রেল। এটি ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রুট।

এই রুটে স্টেশন হবে মোট ১২টি। এগুলো হলো- বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।
আর পূর্বাচল রুটে নতুন বাজার স্টেশনটি হবে পাতালে। এরপর নতুন বাজার থেকে পূর্বাচলের নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জ পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে। এ রুটে আবার স্টেশন হবে নয়টি।
এগুলো হলো – নতুন বাজার, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, মাস্তুল, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল পূর্ব, পূর্বাচল টার্মিনাল ও পিতলগঞ্জ ডিপো।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এটি নির্মাণ হলে দৈনিক আট লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ