মিথুন আশরাফ – প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে দেশে ও দেশের বাইরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছি। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। নৌকা মার্কা স্বাধীনতা এনেছে, নৌকা মার্কায় যত উন্নয়ন দিয়েছে, সামনেও যত উজান ঠেলে হোক, নৌকা মার্কা এগিয়ে যাবে। রবিবার কালশী মোড় বালুর মাঠে আয়োজিত কালশী ফ্লাইওভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় নির্মিত কালশী উড়ালসড়কটি যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের পর উড়ালসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। মিরপুর, মিরপুর ডিওএইচএস, পল্লবী, কালশী, মহাখালী, বনানী, উত্তরা ও ঢাকা বিমানবন্দরে যাতায়াতের সুবিধার্থে এ উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটের অধিকারে বিশ্বাস করে। অনেক সংগ্রামের পথ বেয়ে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আছি বলেই উন্নয়ন করতে পেরেছি। আর আগামীর বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ। আমরা সম্মানের সঙ্গে বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। কারো কাছে হাত পাতবো না। এজন্য সামনে যে খাদ্য সংকট আছে, সেজন্য ফসল উৎপাদন করেন। নিজেদের চাহিদা পূরণ করবো। দরকার হলে অন্যদের সহযোগিতা করবো।
শেখ হাসিনা বলেন, কেউ যদি ভোট চুরি করে, এদেশের মানুষ মেনে নেয় না। ৯৬ সালে কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া ভোট চুরি করেছিল। পরে জনগণের আন্দোলনের ফলে খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ২০০১ সালে দুর্নীতি আর জঙ্গিবাদে বাংলাদেশের মর্যাদা ধূলিসাৎ করেছে। ২০০৮ এর নির্বাচনে তারা ৩০০ সিটের মধ্যে মাত্র ৩০ সিট পেয়েছে। আর আমরা মানুষের মন জয় করে তাদের ভোটে ক্ষমতায় এসেছি। মানুষের ভোট ও সমর্থনের মর্যাদাও রেখেছি।
এ সময় ঢাকায় বসবাসরত উর্দুভাষী অবাঙালিদের উন্নত জীবনযাপনের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ফ্ল্যাট করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, উর্দুভাষীদের জন্য উন্নতমানের ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য নির্দেশ দিয়েছি। সুন্দরভাবে যেন এই অবাঙালিরা বসবাস করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দেবো।
তিনি বলেন, আমরা জনগণের সুবিধার দিকে লক্ষ্য করেই পরিকল্পনা করি। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করে দেই। বিভক্তির পর দুই সিটিতে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নানা উন্নয়ন প্রকল্প করা হয়েছে। দক্ষিণে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ফ্ল্যাট করে দিয়েছি। উত্তরেও করে দেবো। উর্দুভাষীদের জন্যও সেটি হবে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে একটি মানুষও ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবে না।
জায়গা পেলেই ভবন নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের কিছু লোক আছে, একটু জায়গা খালি পেলেই ভবন নির্মাণ করতে আসে। এই যে কালশী বালুর মাঠ; এটা বিনোদন পার্ক হবে। এখানে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার ব্যবস্থা হবে। শিশুদের জন্য পার্ক করা হবে। যুবকদের জন্য ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবস্থা থাকবে। প্রবীণদের জন্য হাঁটার ব্যবস্থাও রাখা হবে। তবে এই মাঠ যেন মাঠ থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যমুনা নদীর ওপর সেতু করতে যাই। তখন রেল সেতুও সংযুক্ত করতে চাই। বিশ্বব্যাংক বাধা দিয়েছিল। তারা বলেছে, সেটা লাভজনক হবে না। এখন আবার বিশ্বব্যাংকই ফিরে এসেছে, যমুনা নদীতে রেল সেতু করতে। আমি অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে। দেশটা আমাদের। কোথায় কী হবে, হবে না। কী লাগবে, লাগবে না। এটা আমরাই ভালো বুঝি। এই ধারণাটা আমাদের থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশটি আমাদের, এ দেশকে আমরা চিনি, দেশকে আমরা বুঝি, কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসবে, সেটিই মানতে হবে? তা হতে দেওয়া যাবে না। আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা থাকতে হবে। নিজেদের দেশ সম্পর্কে জানতে হবে। এ সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে যোগাযোগের ব্যাপক উন্নত হয়েছে। মেট্রোরেল চালু হয়েছে। ভূগর্ভস্থ টানেলও চালু করতে যাচ্ছি। শুধু তাই নয়, পাতাল রেল করার পদক্ষেপ নিয়েছি। ঢাকার চারপাশে চারটি নদীতে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নৌপথ চালুর পরিকল্পনা করছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গত নভেম্বর মাসে একযোগে ১০০ সেতু ও ১০০ সড়ক উদ্বোধন করেছি, যা এর আগে কখনো কোনো সরকার করতে পেরেছে কিনা আমার জানা নেই।
ঢাকা যানযটমুক্ত করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা শহরকে যানযটমুক্ত করবার জন্য হানিফ ফ্লাইওভার, মগবাজার মালিবাগ ফ্লাইওভার, বনানী, আহসানুল্লাহ ফ্লাইওভার চালু করেছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ চারলেনে উন্নীত সম্পন্ন করেছি।
তিনি বলেন, খুব শিগগির কর্ণফুলি তলদেশ থেকে বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করব, যা হবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের রেল রাস্তার সম্প্রসারণ কাজ করছি। শুধু তাই নয়, ঢাকা থেকে রংপুর, সিলেট মহাসড়কে চার লেনের উন্নীত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, যা দ্রুত যানের জন্য ব্যবহার হবে। এদিকে পদ্ম সেতু ভাঙা থেকে খুলনা, মোংলা পর্যন্ত রাস্তা ও রেললাইন যোগাযোগের কাজ এগিয়ে চলেছে।
‘আগামীর বাংলাদেশ হবে স্মার্ট বাংলাদেশ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমরা কারো কাছে হাত পেতে চলতে চাই না। নিজেদের যে সম্পদ আছে তার ওপর ভিত্তি করেই আমরা এগিয়ে যাবো। আমরা বাংলাদেশকে একটি স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত করবো।
আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় আছি বলেই দেশের এতো উন্নয়ন হচ্ছে। আগামীতেও আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবো এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
বিএনপির সমালোচনা করে সরকার প্রধান বলেন, বিএনপি কখনোই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেনি। তারা ভোট কারচুপি করে ক্ষমতায় এসেছে। ভোট চোরদের জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে পারছি। বিশ্বের যে শহরেই বাংলাদেশের নাগরিকরা যায়, তারা বিশেষ মর্যাদা পায়। বিশ্ববাসী এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের দেখলে সমীহ করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে গোটা বিশ্বে এখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। এ অবস্থায় আমাদের টিকে থাকতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইউনিট প্রতি ১২ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। অথচ আমরা বিক্রি করছি তিন টাকা থেকে ছয় টাকার মধ্যে। বিদ্যুতে আর ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ আমাদের খাদ্য কিনতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে এখন খাদ্যের দাম অনেক বেশি। আমাদের উচ্চ মূল্যে খাদ্য কিনে যোগান দিতে হচ্ছে।
সুখী-সমৃদ্ধ, উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করে জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করা- এটাই আমাদের লক্ষ্য।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলব, এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। কাজেই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করে জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করা, এটাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্ট বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব। এই ঢাকা সিটিও স্মার্ট সিটি হবে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা সেজন্যই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, একটি কথা বলতে চাই, অনেক সংগ্রামের পথ বেয়ে জনগণের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি। জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে, আমরা ২০০৮-এর নির্বাচনে জয়ী হয়েছি। ২০১৪ ও ২০১৮ নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকারে এসেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর পেছনে ফিরে তাকাবে না, কারো মুখাপেক্ষী হবে না। আমরা নিজের ক্ষেতে ফসল ফলাব, নিজের দেশকে উন্নত করব। কারো কাছে হাত পেতে চলব না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। আমরা সম্মানের সঙ্গেই বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইব্রাহিম উপস্থিত ছিলেন।








