শাম অঞ্চলকে ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও পূর্ণ ফিলিস্তিন এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। যা নবী-রাসূলদের ভূমি হিসেবে পরিচিত। কোরআন ও হাদিসে শামের ভূমির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা, বরকত এবং ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশিত হয়েছে। এটি কেয়ামতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বিশেষ করে ঈসা (আ.)-এর আগমন এবং দাজ্জালের আগমনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শাম অঞ্চল কোরআন এবং হাদিসে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র অতীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ভবিষ্যতে ঈমান, আল্লাহর সাহায্য, এবং ইসলামিক আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু হবে। নবীজি (সঃ) শাম ভূমির প্রতি দোয়া করেছেন। তার উম্মতকে এই অঞ্চলের বরকত থেকে লাভবান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শাম অঞ্চলের ফজিলত, ঈসা (আ.)-এর আগমন, এবং হাশরের ময়দান হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
কোরআনে শাম অঞ্চলের বরকত নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যাদের দুর্বল মনে করা হতো তাদেরকেও আমি উত্তরাধিকার দান করেছি, এই ভূখণ্ডের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের যাতে আমি বরকত সন্নিহিত রেখেছি।” (সুরা আরাফ: ১৩৭) এখানে শামকে বরকতময় ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনকারী। (সুরা বনি ইসরাঈল: ০১) এই আয়াতটি সরাসরি শাম অঞ্চলের উল্লেখ করে এবং এটিকে বরকতপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষত, এই অঞ্চলটি ইসলামের ইতিহাসে অগণিত নবী-রাসূলের জন্মস্থান এবং তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ঘটেছে এখানে।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) শামের জন্য বরকত দানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমাদের শাম দেশে ও ইয়েমেনে বরকত দান করুন।” (বুখারি: ১০৩৭)। এই দোয়া শাম অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতের অধিকারী হিসেবে তুলে ধরেছে।
রাসুল (সঃ) শামের ভূমিকে উম্মতের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “যখন শামভূমি ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, তখন তোমাদের মধ্যেও কোনো কল্যাণ থাকবে না। আর আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, তাদের যারা ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তারা কেয়ামত পর্যন্ত তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না।” (তিরমিজি ২১৯২)। এই হাদিসটি শাম অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং এর ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। যেখানে শামের মানুষ চিরকাল আল্লাহর সহায়তা প্রাপ্ত থাকবে।
ইসলামের শেষ সময়ে শামের ভূমি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইমাম কুরতুবি, ইবনে কাসির, এবং ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, “শাম হবে হাশরের ভূমি।” রাসুলুল্লাহ (সঃ) একাধিক হাদিসে বলেছেন, “সেখানে তোমাদের হাশর হবে।” (মুসনাদে আহমদ)। এটি শামের ভূখণ্ডের আধ্যাত্মিক ও পরলৌকিক গুরুত্বকে চিহ্নিত করে, যেখানে কিয়ামতের দিন পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একত্রিত হবে।
রাসুল (সঃ) শামের ভূমিকে এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন যেখানে ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন। তিনি বলেছেন, “দাজ্জাল শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে বের হয়ে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে। তার অনিষ্টতার পর আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে দামেস্কের পূর্ব দিকের শুভ্র মিনারে অবতরণ করাবেন। ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন শামের বাবে লুদ নামক স্থানে।” (মুসলিম: ২৯৩৭)। এটি শামের ভূমিকে একদিকে যেমন পৃথিবীর ধর্মীয় যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করে, তেমনি ইসলাম ও মুমিনদের বিজয়ের প্রতীকও হিসেবে উপস্থাপন করে।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) একাধিক হাদিসে শামের ভূমিকে ইসলামের ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “জেনে রেখো! যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে তখন ঈমান শামেই অবস্থান করবে এবং কিতাবুল্লাহ এবং ইসলামের মজবুত ঘাঁটিও সেখানেই থাকবে।” (মুসতারকে হাকিম)। এটি শামের ভূমির গুরুত্ব এবং ইসলামের অটুট ভিত্তি হিসেবে এর স্থানকে প্রতিস্থাপন করে।
রাসুল (সঃ) তার সাহাবীদের শামের ভূমিতে আশ্রয় নেবার জন্য আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন, “তখন শামের ভূমিকে আঁকড়ে ধরবে।” (মুসনাদে আহমদ: ৯/১৪৫)। এটি নির্দেশনা দেয় যে, কিয়ামতের আগমনের সময় শামের ভূমি হবে মুমিনদের শেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে তারা নিরাপত্তা পাবে।








