,

মগবাজারে অস্ত্রের মহড়া নিয়ে উত্তেজনা, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গণপিটুনি

রাজধানীর মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় বুধবার রাত আটটার দিকে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। জানা গেছে, ওই ব্যক্তি মাহফুজুর রহমান (দীপু), যিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন, গণপিটুনির পর মাহফুজুর রহমানকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে তাঁকে তাঁর পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, বুধবার রাত আটটার দিকে টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করছিলেন। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওই এলাকার একটি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, যেখানে স্থানীয়দের সন্ত্রাসীদের ধরতে বলা হয়। মাইকের ঘোষণার পর উত্তেজিত জনতা দ্রুত জড়ো হয়ে যায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

জনতার একাংশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধাওয়া করে এবং এ সময় মাহফুজুর রহমান ধরা পড়ে যান। তখন উপস্থিত জনতা তাঁকে মারধর শুরু করে। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে থানার গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

গণপিটুনির ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয়। রাত দেড়টার দিকে পুলিশের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান যে, ঘটনার পরপরই পুলিশ এবং সেনাবাহিনী যৌথভাবে মগবাজার টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় অভিযান পরিচালনা শুরু করে। ওই এলাকায় এখনো অভিযান চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, অস্ত্রের মহড়ার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। এই ঘটনায় আর কেউ আহত হয়েছে কি না, বা কেউ আটক হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ তখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গণপিটুনির শিকার মাহফুজুর রহমান ওরফে দীপু একসময় কুখ্যাত সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। সুব্রত বাইন বাংলাদেশের এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী, যিনি বর্তমানে ভারতের কারাগারে বন্দি বলে জানা যায়। মাহফুজুর রহমান তাঁর বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম উল্লাহ জানান, রাত আটটার দিকে টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে গোলযোগের খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, মাহফুজুর রহমান গণপিটুনির শিকার হয়েছেন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছেন। এরপর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে নিজেদের গাড়িতে তোলে এবং দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর মাহফুজুর রহমানকে তাঁর পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

এলাকাবাসীর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ত্রধারীদের প্রকাশ্যে মহড়া দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করে। তাই তাঁরা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এখানে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন অপরাধী চক্রের আনাগোনা দেখা যায়। পুলিশ থাকলেও কখনো কখনো সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। তাই মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর সবাই একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।”

পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এই ঘটনার পরপরই অভিযান শুরু করেছেন এবং ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনির এই ঘটনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, সাধারণ মানুষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে এখন আরও সচেতন হয়ে উঠছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য নিজেরাই ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে গণপিটুনি কখনোই আইনসম্মত প্রতিক্রিয়া নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি না হয়।

বর্তমানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ