সম্প্রতি লন্ডনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে বৈঠকটির কথা স্বীকার করা হয়েছে, বিএনপির পক্ষ থেকে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনেকটাই জটিল আকার ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠক জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে। বিশেষ করে জামায়াতের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, যা বিএনপির সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন এই বৈঠকের মাধ্যমেই দুই দলের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসতে শুরু করেছে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, এখনো বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে পুরোদমে জোট গঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে নির্বাচনি সমঝোতা কিংবা পুনরায় জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিএনপি এখনো ডিসেম্বরের মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অপরদিকে জামায়াতও এখন বলছে তারা রমজানের আগেই জাতীয় নির্বাচন চায়। আগে জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিচ্ছিল, এখন জাতীয় নির্বাচনকে এগিয়ে আনছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য কমার একটি বড় ইঙ্গিত।
জামায়াতের আমির এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা তিনটি শর্ত পূরণে আগ্রহী—দৃশ্যমান সংস্কার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। বিএনপির নেতারাও বলছেন, এই দাবিগুলোর সঙ্গে তাদের অবস্থান অনেকটাই মিলে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এই লন্ডন বৈঠকের মাধ্যমে আবারো তাদের মধ্যে ঐক্য ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বৈঠকের বিস্তারিত জানা না গেলেও, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার ফলেই দুই দলের দূরত্ব কমছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হলে নির্বাচনের পথও সহজ হয়ে উঠবে।
তবে তিনি এটাও জানান, ঠিক কেমন ধরনের জোট হবে—তা এখনই বলা কঠিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়টি মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে জোট নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি, তবে রাজনীতি, সংস্কার এবং নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তারা তৃতীয় কোনো পক্ষ যেন সুযোগ না নিতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর প্রসঙ্গও আসে। তবে জামায়াত জানায়, তারা এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। তারা বিএনপির শত্রু নয় বরং দীর্ঘ ২২ বছর একসঙ্গে রাজনীতি করেছে।
জামায়াতের আমির বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, সেখানে রাজনৈতিক আলোচনা না হওয়াটা অস্বাভাবিক। তবে কোনো নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে নয়, বরং সামগ্রিক বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, এবার জোট গঠনের সিদ্ধান্ত অনেক কিছু নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয় কি না তার ওপর। পাশাপাশি, বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে—যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তাহলে জাতীয় সরকার গঠন করবে, যেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অংশ নেওয়া দলগুলোকে স্থান দেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াত মাঠে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করছে। একে অপরের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করছে এবং প্রায় সব ইস্যুতে অবস্থান বিপরীত।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয় জামায়াত। পরে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। ২০২২ সালে তারা জোট থেকে বেরিয়ে এলেও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে উভয় দলই সক্রিয় ছিল। এমনকি খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর জামায়াতের নেতারা তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।








