শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

একজন শিশুর চোখে প্যালেস্টাইন : প্রজন্মের কান্না, পৃথিবীর লজ্জা

কাশ্মীর হামলা, প্রতিক্রিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সংকট

একটা যুদ্ধ কেবল বুলেট, বোমা আর বন্দুকের গল্প নয়। যুদ্ধের প্রকৃত নির্মমতা ধরা পড়ে যখন তা একটি নিষ্পাপ শিশুর চোখ দিয়ে দেখা হয়। প্যালেস্টাইনের গাজা উপত্যকা আজ পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের নাম। প্রতিদিনের সহিংসতা, বোমার আঘাত আর মৃত্যুর মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা—নিরপরাধ, নিষ্পাপ ও স্বপ্নময় প্রাণগুলো।

প্যালেস্টাইনে যখন ইসরায়েলের ছোঁড়া একেকটি বোমার শব্দে প্রকম্পিত হয় গাজার আকাশ-বাতাস, তখন শুধু মাটিই কেঁপে ওঠে না, কেঁপে ওঠে একেকটি শিশুর শৈশবও। স্কুলের ঘণ্টার পরিবর্তে যখন শোনা যায় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, তখন বোঝা যায়, একটি প্রজন্ম কেমন করে স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলছে।

প্যালেস্টাইনে জন্মগ্রহণ করা একটি শিশু জীবনের শুরু থেকেই অশান্তি, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। তাদের শৈশবে থাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরের স্মৃতি, মাঠে খেলার বদলে আশ্রয়কেন্দ্রে অপেক্ষার প্রহর, আর মা-বাবার কোলে চেপে নিশ্চিন্ত ঘুমের বদলে থাকে বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন দেহ।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে প্যালেস্টাইনের অসংখ্য শিশু বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। আর যারা বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই আহত, পঙ্গু অথবা মানসিকভাবে চরম আঘাতপ্রাপ্ত। এই শিশুরা কেবল শারীরিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত নয়, তারা হারিয়েছে তাদের শৈশব স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের স্বাভাবিক পথ।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে গাজার শিশুদের জীবন। একজন প্যালেস্টানিয়ান শিশুর জন্য ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি কেবল অভিধানে রয়ে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রও আর নিরাপদ নয় তাদের জন্য। স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ—সবই বোমার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি বোমার শব্দ একটি শিশুর মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে যায়, যা কোনো চিকিৎসায় সারানো সম্ভব নয়।

যারা যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে, তাদের কাছে একটি শিশু কেবল একটি সংখ্যা, একটি উপাত্ত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একগুচ্ছ স্বপ্ন, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা। একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল তার জীবন শেষ হওয়া নয়; তার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় একটি পরিবারের আনন্দ, একটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

বিশ্বজুড়ে যখন উন্নত বিশ্বের শিশুরা উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে বড় হচ্ছে, নতুন নতুন আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখছে, তখন গাজার শিশুদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একটি নিরাপদ রাত, কিছুটা নিঃশ্বাসের অবকাশ, আর পরিবারের সবাইকে জীবিত দেখা। এই অসম বিভাজন সভ্যতার জন্য একটি ভয়ানক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবতার সবচেয়ে করুণ দিক হলো—যখন একটি শিশু প্রশ্ন করে, “আমার কী দোষ ছিল?” সেই প্রশ্নের কোনো জবাব পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা দার্শনিক দিতে পারে না। কারণ, এই প্রশ্নে তাদের গায়ে গুলি বিঁধে না, তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়না।

প্যালেস্টাইনের শিশুরা কোনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা বোঝে না। তারা জানে না ভূখণ্ডের বিরোধ কি, জানে না কূটনীতির জটিলতা। তারা শুধু জানে, তাদের মা কান্নাকাটি করেন, তাদের ভাই আর ফিরে আসে না, তাদের স্কুল আর খোলা হয় না।

শিশুদের চোখে যুদ্ধ মানে প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়া, দিনের আলোতেও আতঙ্কিত হয়ে থাকা। যারা আজ এই শিশুগুলোর দুর্দশার ছবি দেখে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছে—এই শিশুরাই একদিন বড় হবে। তাদের মধ্যে জন্ম নেবে ক্রোধ, ক্ষোভ, প্রতিশোধ। এক প্রজন্মের কষ্ট যখন অবহেলায় উপেক্ষিত হয়, তখন পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে ওঠে অস্থির, অনিরাপদ, এবং সহিংসতাপূর্ণ।

বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের এখনই ভাবতে হবে—এই শিশুগুলোর জন্য আমরা কী উত্তর রেখে যাচ্ছি? আমাদের নীরবতা কি এই অপরাধের অংশ নয়? যুদ্ধে শুধু সৈনিকদের মৃত্যু হয় না, সবচেয়ে গভীর ক্ষতি হয় শিশুদের মনে, মননে, ভবিষ্যতে।

প্যালেস্টাইনের শিশুদের বাঁচাতে কেবল ত্রাণ নয়, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সত্যিকার মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ।

মানবতা আজ এক কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। যদি এখনই আমরা এই শিশুদের কান্না না শুনি, তাহলে ভবিষ্যত ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

এখন প্রশ্ন হলো—বিশ্ব কি এই চিত্র দেখেও নির্বিকার থাকবে? কেবল উদ্বেগ জানিয়ে, বিবৃতি দিয়ে দায়মুক্তি সম্ভব নয়। একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণ হারানো নয় বরং একটি সম্ভাবনার শেষ। একেকটি শিশু মানে একেকটি জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ যদি শৈশবেই ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই জাতি আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

আমার এই লেখনী কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষ নিয়ে লেখা নয়। এটি একটি মানবিক আহ্বান—শিশুদের জন্য, তাদের শৈশবের জন্য এবং সর্বোপরি মানবতার জন্য।

একটা যুদ্ধ থামানো হয় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে, কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় মানবিক চেতনাতে। আমরা যদি এই নিরীহ শিশুদের কান্না উপেক্ষা করি, তাহলে আমাদের সভ্যতাকে আর মানবিক বলা চলে না। কারণ পৃথিবীর কোথাও যদি একটি শিশু প্রতিদিন ভয় নিয়ে ঘুমায়, তাহলে এই পৃথিবীর কেউই প্রকৃত নিরাপদ নয়।

একজন শিশুর চোখে দেখা যুদ্ধ কেবল ভয়ের নয়, লজ্জারও। এই লজ্জা আমাদের সবার, এই দায় এড়ানোর নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ