বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যেন পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয়। এই যুগে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব—এসব নাম কারও কাছে নতুন নয়। তবে প্রশ্ন হলো, এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো আমাদের দেশের যুবসমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? উপকারে, নাকি অপকারে?
একটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে, আগে যেকোনো তথ্য জানার জন্য পাঠ্যবই, লাইব্রেরি কিংবা শিক্ষকের দ্বারস্থ হতে হতো। এখন একজন তরুণ কয়েক সেকেন্ডেই গুগলে সার্চ করে কিংবা ইউটিউবে দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যায়। অনেকেই ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে নিজস্ব জ্ঞান ও প্রতিভা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। কেউ গান গেয়ে, কেউ আঁকাআঁকি করে, কেউ কবিতা লিখে—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। অর্থ উপার্জনের সুযোগও এসেছে এই মাধ্যমগুলো ঘিরে। ইনফ্লুয়েন্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ডিজিটাল মার্কেটার—এসব নতুন পেশার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অন্য পিঠেও রয়েছে অন্ধকার। অনেক তরুণ ফেসবুক ও টিকটকের অতিরিক্ত আসক্তিতে পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করেও মনে থাকে না তারা কী দেখেছে। তৈরি হচ্ছে ‘ডোপামিন অ্যাডিকশন’—মাথার ভেতর সবসময়ই নতুন কিছুর খোঁজে ছটফটানি। বাস্তব জীবনের বন্ধনগুলো ঢেকে যাচ্ছে ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের নেশায়।
বিশেষ করে টিকটক প্ল্যাটফর্মে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের প্রকাশ করার নামে এমনসব কনটেন্ট তৈরি করছে যা শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্করা হুবহু অনুসরণ করছে এসব কনটেন্ট, না বুঝেই নেমে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভাইরাল হবার লোভে অনেকে নিজের এবং অন্যের জীবন বিপন্ন করে ফেলছে। কেবল বিনোদনের খাতিরে অস্থিরতা, আত্মপ্রচারের নেশা আর নিজেকে ‘সেলিব্রিটি’ ভাবার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে।
এই প্রবণতাকে পুরোপুরি দোষারোপ করাও উচিত নয়, কারণ মূল সমস্যা প্রযুক্তির নয়, বরং ব্যবহারের। যেকোনো শক্তিশালী জিনিস যেমন উপকারে লাগতে পারে, তেমনি অপব্যবহারেও বিপদ ডেকে আনতে পারে। একটি ছুরি যেমন ফল কাটতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি অপরাধেও ব্যবহৃত হতে পারে—এটি নির্ভর করে ব্যবহারকারীর নীতিবোধের উপর।
সোশ্যাল মিডিয়া যেমন নতুন জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং বিশ্বসংযোগের দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মসম্মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার প্রবণতা এবং অবসাদে ভোগার হার বেশি।
সমস্যা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর উদ্যোগ খুব কম। স্কুল-কলেজে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা শেখানো হয় না। ফলে যুবসমাজ কীভাবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে উপকার পেতে পারে, সেটাই তারা জানে না।
অভিভাবকরাও সন্তানের অনলাইন কর্মকাণ্ড নিয়ে উদাসীন। অনেকেই ভাবেন, মোবাইল হাতে দিলেই বাচ্চা ‘শান্ত’ থাকে। কিন্তু বুঝে উঠতে উঠতেই সেই ‘শান্ত’ বাচ্চাটি হয়তো এক ভয়ংকর ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে পড়ে, যেখানে বাস্তবের কোনো মূল্য নেই।
তবে আশার কথা হলো, পরিবর্তনের সূচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। অনেকেই এখন গঠনমূলক কনটেন্ট তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছে। বই নিয়ে আলোচনা, বিজ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট, ভাষা শেখানো, ক্যারিয়ার গাইডেন্স—এসব এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করছে। অনেকে দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কলারশিপ সম্পর্কে জানছে ইউটিউব বা ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে।
এখন সময় এসেছে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ইতিবাচক দিককে আরও এগিয়ে নেওয়ার এবং নেতিবাচক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। স্কুল-কলেজে ডিজিটাল সচেতনতা ক্লাস বাধ্যতামূলক করা উচিত। পরিবারেও সন্তানের মোবাইল ব্যবহার সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাতেই এক দ্বিমুখী তলোয়ার। একদিকে বিশাল সম্ভাবনার দরজা, অন্যদিকে আত্মবিনাশের পথ। আমরা চাইলে এর সাহায্যে বিশ্বজয় করতে পারি, আবার অসতর্ক হলে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেও পারি।
পরিশেষে বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াকে না বলা নয়, বরং তাকে কীভাবে ব্যবহার করবো—সেই শিক্ষাটাই জরুরি। যুবসমাজ যদি সচেতন হয়, তাহলে এই মাধ্যম হতে পারে এক আশীর্বাদ, নয়তো এক অভিশাপ।








