দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিত্যপণ্যের দামে ভোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন। শীতকালীন সবজির মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই বাজারে গ্রীষ্মকালীন সবজির সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে প্রায় সবজির। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মুরগির বাজারের অস্থিরতা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির সরবরাহ সংকটে দামের ঊর্ধ্বমুখী ধারা
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, খিলক্ষেত, নয়াবাজার, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালীন সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বাজারে দাম বেড়ে গেছে প্রায় সব ধরনের সবজির। করলা, বেগুন, বরবটি, চিচিংগা, কচুর লতি, কাঁকরোল, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি ৬০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতারা বলছেন, এখনো পুরোপুরি গ্রীষ্মকালীন সবজির মৌসুম শুরু হয়নি। ফলে যে ক’টি সবজি বাজারে এসেছে, তার দাম বেশি। তবে আগামী কিছুদিনে সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোক্তাদের অভিযোগ: সিন্ডিকেটের দাপট
বাজারের এই অস্থিরতায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা মনে করছেন, এটি সিন্ডিকেটের কারসাজি। ফিরোজ নামে এক ক্রেতা জানান, গরমকালে পণ্যদ্রব্যের চাহিদা বেশি থাকায় এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তার মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি।
একইভাবে জেসমিন নামের আরেকজন ভোক্তা বলেন, বর্তমানে প্রতিটি জিনিসের দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের কিছু করার নেই। তারা যেন নিরুপায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছেন কেবল।
বিশেষ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে বেশি
পেঁপে, কচুর লতি, বরবটি, সজনে ডাটা, কাঁকরোলের মতো সবজির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। পেঁপের ক্ষেত্রে গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়।
এছাড়া কাঁচামরিচ ও ধনেপাতার দামও বেড়েছে। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে, আর ধনেপাতা ২০০ টাকা প্রতি কেজিতে। বিক্রেতাদের দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে এসব পণ্য দ্রুত পচে যাওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে।
মুরগির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা
সবজির পাশাপাশি মুরগির দামেও দেখা গেছে বড় ধরনের উর্ধ্বগতি। খামারিদের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত।
কারওয়ান বাজারের এক মুরগি বিক্রেতা জানান, খামারগুলোতে উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১৮০-১৯০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ২৭০-২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম ৬৫০-৬৮০ টাকা প্রতি কেজি। হাঁসের দামও বাড়তি, প্রতি পিস ৬০০-৭০০ টাকা।
ডিম ও পেঁয়াজের দামেও ঊর্ধ্বগতি
ডিমের বাজারেও চাপ দেখা যাচ্ছে। লাল ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়, সাদা ডিম ১১৫-১২০ টাকায়, হাঁসের ডিম ১৮০-২০০ টাকা ও দেশি মুরগির ডিম ২২০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হচ্ছে।
পহেলা বৈশাখের পর থেকেই পেঁয়াজের দামও বেড়ে গেছে। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, সামনে আরও দাম বাড়তে পারে।
কিছু পণ্যে স্থিতিশীলতা
যেখানে বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে, সেখানে আলু, মাছ ও গরুর মাংসের বাজারে এখনো স্থিতিশীলতা রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ২০-২২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজিতে। আমদানি করা রসুন ১৮০-২২০ টাকায় ও দেশি রসুন ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে মিলছে।
মাছের বাজারেও তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। রুই, কাতল, চাষের শিং, মাগুর, কৈ, কোরাল, পাঙাশ ও তেলাপিয়া আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। রুই মাছ ৩৫০-৪২০ টাকা, কাতল ৩৮০-৪৫০ টাকা, শিং ৫৫০, মাগুর ৫০০, কৈ ২০০-২৫০ টাকা, কোরাল ৭৫০ টাকা, পাঙাশ ১৮০-২৩০ ও তেলাপিয়া ১৫০-২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গরু ও খাসির মাংসেও তেমন পরিবর্তন নেই
গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা কেজিতে। খাসির মাংস ১২০০ টাকা এবং ছাগলের মাংস ১১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের সপ্তাহের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে একই রয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষ এখন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। প্রতিদিনকার প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে বাড়তে যেখানে পৌঁছেছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির উপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই অবস্থায় সরকার যদি বাজার মনিটরিং জোরদার না করে, তাহলে আগামী দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে। ভোক্তারা আশাবাদী— সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।








