নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলামভিত্তিক সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিন মাসব্যাপী বিভাগীয় সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। শনিবার (৩ মে) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক মহাসমাবেশ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া চার দফা দাবি আদায়ে আগামী ২৩ মে বাদ জুমা দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান এই কর্মসূচিগুলো মহাসমাবেশের মূল মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন। মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
মহাসমাবেশে নারীর ‘ন্যায্য অধিকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ‘ইসলামি দৃষ্টিভিত্তিক নারী কমিশন’ গঠনের দাবি জানানো হয়। এছাড়া, সরকারের প্রস্তাবিত নারী অধিকার সংস্কার কমিশনকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানায় হেফাজত।
সমাবেশে আরও দাবি করা হয়— শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই ঘটনায় যারা দায়ী, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের বিচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে।
সাংবাদিকতার পেশাকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্ম অবমাননার হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গণমাধ্যম সংস্কারের দাবিও তোলা হয়। হেফাজত চায়, ধর্ম অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সংযুক্ত করে আইন বাস্তবায়ন করা হোক।

হেফাজতের পক্ষ থেকে সমাবেশে ১২ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হলো—
নারী অধিকার সংস্কার কমিশন বাতিল করে আলেমদের সমন্বয়ে নতুন কমিশন গঠন।
সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং বহুত্ববাদ শব্দ বাদ দেওয়া।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
আওয়ামী লীগকে ‘সন্ত্রাসী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ও তাদের বিচার করা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা।
চিন্ময় দাসের জামিন বাতিল করা।
ইসলামি শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায় থেকে বাধ্যতামূলক করা।
কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করা।
রাখাইন প্রদেশে করিডোর না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন এবং ধর্ম অবমাননা সংশ্লিষ্ট সুপারিশ বাতিল।
ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হেফাজতের কর্মী-সমর্থকেরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল ৯টায় মূল সমাবেশ শুরু হয়। এতে হেফাজতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি অন্য ধর্মীয় দল ও সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন এবং বক্তব্য রাখেন।
হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর লেখা বক্তব্য পাঠ করেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, “গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পাই। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এনজিও প্ররোচনায় ইসলামবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে হেফাজত তা মেনে নেবে না।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “নারী অধিকার কমিশন বাতিল করতে হবে, নয়তো আন্দোলন আরও কঠোর হবে।”
মহাসমাবেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন হেফাজতের নায়েবে আমির ও বেফাকুল মাদারিসিন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, “এই দেশে আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বাস্তবমুখী সংস্কার চাই, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “বহুত্ববাদ বাদ দিয়ে কোরআনের আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত। যারা ধর্ম অবমাননা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই জনগণের চাওয়া।”
দুপুর ১টা ১১ মিনিটে হেফাজতের আমিরের পক্ষ থেকে মুনাজাতের মাধ্যমে সমাবেশের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজতে ইসলামের এই কর্মসূচি আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের অবস্থান জানান দেওয়ার কৌশল হতে পারে। একদিকে ধর্মীয় দাবির মাধ্যমে তারা কট্টরপন্থী জনসমর্থন ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরব থেকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষ করে নারী অধিকার বিষয়ক প্রস্তাবিত কমিশন নিয়ে তাদের আপত্তি থেকে বোঝা যায়, সংগঠনটি ধর্মীয় চেতনার নামে সামাজিক সংস্কার উদ্যোগের বিরোধিতা করছে।
হেফাজতের এই মহাসমাবেশ রাজনৈতিক পরিসরে একটি বড় বার্তা দিয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন এবং দাবিগুলো আদায়ে তারা কতটা সক্রিয় হয়—তা সময়ই বলে দেবে। তবে ধর্মীয় অনুভূতির নামে রাজনীতির নতুন রূপরেখা তৈরির যে প্রয়াস চলছে, তা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।








