সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি: জ্বালানি, জোট এবং যুদ্ধের রূপরেখা

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর অঞ্চল। এখানকার রাজনীতি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও নির্ধারক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাত, অদলবদল হওয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক, জ্বালানিকে কেন্দ্র করে রূপরেখা পরিবর্তন, এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে।

ইতিহাসের ছায়া ও আধুনিক সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক জটিলতা মূলত ইতিহাস ও ধর্মভিত্তিক বিভাজনের ফল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি অঞ্চলটিকে কৃত্রিমভাবে ভাগ করে দেয়, যার প্রভাব আজও রয়ে গেছে। এর পর থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট, ইরান-সৌদি আরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করেছে।

ইরান-সৌদি আরব সম্পর্ক: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে পুনর্মিলন?

বহু বছর ধরে শিয়া ইরান ও সুন্নি সৌদি আরব একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান করেছে। এই দ্বন্দ্ব কেবল ধর্মীয় নয়, বরং প্রভাব বিস্তার ও নেতৃত্বের লড়াই। তবে চীন ও ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এই অঞ্চলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি ইয়েমেনের যুদ্ধ ও লেবানন-সিরিয়ায় প্রভাব খাটানো প্রশ্নে একটি সমঝোতার সূচনা হতে পারে। তবে বাস্তবায়ন কতটা গভীর তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত: নতুন রক্তপাত, পুরনো কূটনীতি

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলা এবং ইসরায়েলের কঠোর পাল্টা আক্রমণ গাজায় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, শিশুরা অনাহারে, এবং হাসপাতাল গুঁড়িয়ে যাওয়ার এই ট্র্যাজেডি বিশ্ববাসীর সামনে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সমস্যাটিকে তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা ও দ্বৈত নীতি মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। আরব দেশগুলোর ভিন্নমত, ইসরায়েলের সঙ্গে স্বীকৃতি কিংবা সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, এসবই এই সংকটের সমাধানকে জটিল করে তোলে।

তেল, গ্যাস ও ভূরাজনৈতিক যুদ্ধ

বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ভাণ্ডার মধ্যপ্রাচ্যে থাকায় এখানকার রাজনৈতিক প্রতিটি পদক্ষেপে তেলের গন্ধ পাওয়া যায়। সৌদি আরব, ইরান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত—তেল গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই করে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল নেওয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এই কারণে এখানকার নেতারা এখন আরও আত্মবিশ্বাসী এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের শর্ত মেনে চলার আগ্রহ কমিয়ে এনেছে।

তুরস্ক, কাতার ও আমিরাত: আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন প্রতিযোগিতা

আরব বসন্তের পর থেকে তুরস্ক ও কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একধরনের উদার ইসলামপন্থী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও আমিরাত পশ্চিমা ঘরানার কর্তৃত্ববাদী, ইসলাম-বিচ্ছিন্ন মডেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে মাঝে মাঝেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জোটবদল দেখা যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা

একসময়ের নিরঙ্কুশ প্রভাবশালী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান হারাচ্ছে। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান এবং সিরিয়া, ইরাকে প্রভাব কমে যাওয়া চীনের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সৌদি-ইরান চুক্তিতে চীনের ভূমিকা, বিপুল বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে চীনের কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক খেলা শুরু করেছে।

সামনে কী?

মধ্যপ্রাচ্য আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে শান্তি ও সমঝোতার ইঙ্গিত দেখা গেলেও অন্যদিকে গোপন যুদ্ধ, বৈরী সম্পর্ক, এবং অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো একটি বিস্ফোরণসক্ষম পরিবেশ তৈরি করছে। এ অঞ্চলে টেকসই স্থিতিশীলতা আনতে হলে শুধু কূটনীতি নয়, বরং গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক সমতা এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন।

বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো যদি নিজেদের স্বার্থের বাইরে গিয়েও মানবিক বিবেচনায় পদক্ষেপ নেয়, তবে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যও একদিন হয়ে উঠতে পারে শান্তির প্রতীক। তবে এখনো সে দিনটি বহুদূর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ