আফসার রেজা, ক্রীড়া সাংবাদিক:
এক উইকেটে শতক ছোঁয়ার পর ম্যাচের গতি যদি হঠাৎ করেই উল্টো দিকে ছুটে যায়—তাও আবার এমন এক গতিতে, যেখানে পরের পাঁচ রানে হারিয়ে বসে ছয়টি উইকেট, তখন বুঝতে বাকি থাকে না—দিনটা আপনার ছিল না।
কলম্বোতে এমন একদিনই কাটাল বাংলাদেশ। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ২৪৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করেছিল টাইগাররা। একসময় বোঝার উপায় ছিল না, ম্যাচটা কোন দিকে যাচ্ছে। আর যখন বোঝা গেল, তখন তা শুধুই হতাশা। বাংলাদেশের ইনিংস থেমে গেছে ১৬৭ রানে, ৭৭ রানের ব্যবধানে হেরে সিরিজেও ১-০তে পিছিয়ে গেলো মেহেদী মিরাজের দল।
এই হারের গল্প শুরু হয় যতটা না ব্যাটিং ব্যর্থতা দিয়ে, তার চেয়েও বেশি এক ‘ধস’ দিয়ে। এমন ধস, যেখানে ব্যাটাররা আসেন, দেখেন আর ফিরে যান। মনে হচ্ছিল, সাজঘরের দরজাটাই যেন ঘূর্ণায়মান।
তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমন—উদ্বোধনী জুটিতে এসেছিলেন জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর গড়তে। কিছুটা স্থিরতা এনে দিয়েছিলেন তারা। যদিও ২৯ রানের বেশি জমেনি জুটি, তবুও ভরসা জাগাচ্ছিল। ইমন ফিরেছেন ১৩ রানে, তবে তামিম ছিলেন স্বচ্ছন্দ্যেই।
তিনে নেমে শান্ত যোগ দেন তামিমের সঙ্গে। জুটি জমে ওঠে। ইনিংসের ১৭তম ওভারে দলীয় ১০০ পূর্ণ হয়—সব ঠিকঠাক। এমন সময় যেন হঠাৎই নাটকের দৃশ্যপট বদলে যায়। রান আউট হয়ে শান্ত (২৩) ফিরতেই ইনিংসের ছন্দ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
১০০ থেকে ১০৫—মাত্র পাঁচ রান এগোতেই সাজঘরে ফেরেন লিটন দাস, তানজিদ তামিম, তাওহিদ হৃদয়, মেহেদি মিরাজ, তানজিম সাকিব ও তাসকিন আহমেদ। তিন ব্যাটার—লিটন, মিরাজ ও তাসকিন আউট হন শূন্য রানে। যে বাংলাদেশ জয়ের দিকে এগোচ্ছিল, সে বাংলাদেশই হঠাৎ খুঁজে পাচ্ছিল না রাস্তা।
এমন পরিস্থিতিতে একটু প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন জাকের আলি। আত্মমর্যাদার লড়াই বলা যেতে পারে তার ইনিংসটিকে। তুলে নেন ফিফটি, কিন্তু ম্যাচের ফল পরিবর্তনের মতো কিছু নয়, কেবল হারের ব্যবধান কমান।
এমন হারের আগে দিনের প্রথম ভাগে একটু আশাবাদ জাগিয়েছিল বাংলাদেশের বোলাররা। টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে শুরুতেই আঘাত আনেন তানজিম সাকিব। অফ স্টাম্পের বাইরে এক ডেলিভারিতে নিশাঙ্কা ক্যাচ দেন উইকেটকিপার লিটনকে। রানশূন্যে ফেরেন তিনি।
পরের ওভারেই তাসকিন ভাঙেন আরেক ওপেনার নিশান মাদুশকার স্টাম্প। তাতে লঙ্কান ইনিংস তখন ২ উইকেটে ১০। এরপর আবারও তাসকিন—শিকার কামিন্দু মেন্ডিস, যিনি শূন্য রানেই ধরা পড়েন মিড-অফে।
২৯ রানে তিন উইকেট পড়ে গেলে স্বস্তি ছিল ড্রেসিংরুমে। কিন্তু এরপরই শুরু লঙ্কান পুনর্গঠনের গল্প। আসালঙ্কা ও কুশল মেন্ডিস মিলে গড়েন ৬০ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি। তবে তানভীর ইসলামের আঘাতে ফেরেন কুশল (৪৫)। এটি তানভীরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেট।
পরবর্তী জুটিও বড় হতে যাচ্ছিল। তখনই মিরাজের অধিনায়কসুলভ চিন্তায় বোলিংয়ে আনা হয় শান্তকে। তাতে সাফল্য আসে চমৎকারভাবে। জানিথ লিয়ানাগে (২০) ধরা পড়েন তানজিম সাকিবের হাতে।
আসালঙ্কা একপ্রান্ত আগলে রাখেন, বাকিরা গিয়েছেন-এসেছেন। দারুণ এক সেঞ্চুরি তুলে নেন বাঁহাতি এই ব্যাটার—১১৭ বলে ১০৬। তার ইনিংসেই ভর করে শ্রীলঙ্কা পৌঁছায় ২৪৪ রানে, ৪৯.২ ওভারে অলআউট হয়ে।
বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। নিয়েছেন ৪ উইকেট। ৪৬ রানে ৩ উইকেট পেয়েছেন তানজিম সাকিব। একটি করে উইকেট এসেছে শান্ত ও তানভীরের ঝুলিতে।
সবশেষে ফিরে তাকালে, মনে হতে পারে—১০০/১ অবস্থানে থাকা দল কিভাবে ১০৫/৭ হয়ে পড়ে? ক্রিকেট এমনই খেলা, যেখানে মুহূর্তে বদলে যায় ভাগ্য, ভেঙে পড়ে আত্মবিশ্বাস। এই ম্যাচও তেমনই এক মনে রাখার মতো উদাহরণ।
তবে মনে রাখার মতো হলেও, বাংলাদেশ নিশ্চয়ই চাইবে এটা যেন আর কখনো ফিরে না আসে।








