(যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দৃশ্য। কোম, ইরান, ২০ জুন ২০২৫ (বাঁয়ের ছবি) ও ২২ জুন ২০২৫ছবি: রয়টার্স)
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তত এক থেকে দুই বছর পিছিয়ে পড়েছে। তবে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
বুধবার (২ জুলাই) পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানান, ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে এসব স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, “আমরা তাদের কর্মসূচি অন্তত ১-২ বছরের জন্য দুর্বল করে দিয়েছি।”
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম একেবারে ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। হামলাকে তিনি ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ বলে বর্ণনা করেন।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রাথমিক প্রতিবেদন, যা গত মাসে ফাঁস হয়, তাতে বলা হয়— হামলায় ইরানের মূল প্রযুক্তি অবকাঠামো অক্ষত রয়েছে এবং সাময়িকভাবে কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে মাত্র।
ইরান নিজেও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করছে না। যদিও কিছু ইরানি কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হামলার প্রভাবকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ ফর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলার পুরো চিত্র এখনো অস্পষ্ট। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, হামলার ঠিক আগে ওই স্থান থেকে কিছু ট্রাক সরিয়ে নেওয়া হয়।
জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ইউরেনিয়াম সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কিছু কনটেইনার হয়তো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, কোন উপাদান কোথায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা।
গ্রোসি আরও বলেন, ইরান কয়েক মাসের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম আবার শুরু করতে পারে। উল্লেখ্য, সমৃদ্ধকরণ হচ্ছে ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এই হামলার পর ইরান আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটির পার্লামেন্ট অভিযোগ করে, আইএইএ তেহরানের তথ্য গোপনে ইসরায়েলকে দিয়েছে। যদিও সংস্থাটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইরানের পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ও আশপাশের কয়েকটি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, হামলার পর আশঙ্কাজনক তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ তারা পায়নি।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই ঘটনায় ইসরায়েল প্রথমে হামলা চালায় ১৩ জুন। তারা অভিযোগ তোলে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
এই হামলার পর পাল্টা আঘাতে ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ইসরায়েল এবং ইরান— উভয় দেশই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে।
ইসরায়েল বলছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করেছে। আর ইরান দাবি করছে, হামলা সত্ত্বেও তারা পারমাণবিক ও সামরিক কাঠামো অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে ইরানকে আইএইএর সঙ্গে আবার সহযোগিতা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, “এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা স্থগিত করাটা খুবই উদ্বেগজনক ও অগ্রহণযোগ্য।”
এ সংঘাতের চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ হয়নি। তবে এটাই স্পষ্ট—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কিছুটা পিছিয়ে গেলেও সেটি ধ্বংস হয়নি এবং পরিস্থিতি এখনও অস্থিরতার মধ্যেই রয়েছে।








