শুক্রবার, ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সংঘাতের পর প্রথমবার জনসমক্ষে আয়াতুল্লাহ খামেনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ১২ দিনের ভয়াবহ সংঘাতের পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার (৫ জুলাই) তেহরানের ইমাম খোমেনি মসজিদে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায়। এতে সমবেত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও আবেগ প্রকাশ পায়।

৮৫ বছর বয়সী এই শীর্ষ নেতা দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসেননি। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর অনুপস্থিতি এবং টেলিভিশনে শুধুমাত্র পূর্ব-রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার হওয়ায় নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল— তিনি হয়তো গোপন বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন বা শারীরিকভাবে অসুস্থ। তবে এই সরাসরি উপস্থিতি সেই সব গুজবের অবসান ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি উপস্থিত জনতার প্রতি হাত নেড়ে ও মাথা নাড়িয়ে সাড়া দিচ্ছেন। তাঁকে দেখে উপস্থিত জনতা দাঁড়িয়ে যায় এবং স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে মসজিদ চত্বর।

উল্লেখ্য, ১৩ জুন শুক্রবার শুরু হয় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি সামরিক সংঘাত। ইসরায়েল কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে নিহত হন ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী। জবাবে ইরানও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যার ফলে অন্তত ২৮ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হন। পুরো সংঘাতে ইরান জানায়, তারা ৯০০ জনের বেশি নাগরিক হারিয়েছে এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার।

এই প্রেক্ষাপটে খামেনির সরাসরি উপস্থিতি কেবল একটি ধর্মীয় আচরণের অংশ নয়, বরং এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা— ইরান এখনো দৃঢ়, নেতৃত্ব অটুট এবং সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যেও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সংকট নেই।

এদিকে, ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেন, “ওয়াশিংটন জানে খামেনি কোথায় আছেন, তবে এখনই তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা নেই।”

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় খামেনি ২৬ জুন প্রচারিত একটি পূর্ব-রেকর্ডকৃত ভাষণে বলেন, “আমরা আমেরিকার মুখে চপেটাঘাত করেছি।” তিনি এতে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলার প্রসঙ্গ তোলেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আপনি একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং আপনার দেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। কিন্তু আপনাকে সত্য বলতে হবে—আপনারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”

ইরান জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় তাদের বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরপরই ইরান জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা IAEA-এর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এ বিষয়ে একটি আইনেও স্বাক্ষর করেন, ফলে IAEA-এর পর্যবেক্ষকরা দেশ ত্যাগ করেন। সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, “ইরানের সঙ্গে আবারও সংলাপ শুরু করে পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ ও যাচাই পুনরায় চালু করা জরুরি।”

২৪ জুন, যুদ্ধ শুরুর ১২ দিন পর, মার্কিন মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে এই সংঘাতের ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান নতুন পরমাণু চুক্তির আলোচনা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সেখান থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

সব মিলিয়ে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সরাসরি জনসমক্ষে আবির্ভাব একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। এটি ইরানি জনগণের মনোবল চাঙা করবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে একটি বার্তা দেবে— ইরান নেতৃত্বশূন্য নয়, বরং সংকটের মধ্যেও তাদের সর্বোচ্চ নেতা দৃঢ়ভাবে আছেন জাতির পাশে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ