নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
বিসিএসে সফল হওয়া মানে যেন সোনার হরিণ ধরা—এ কথাটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় একেবারেই খাটে। হাজারো প্রার্থীর মধ্যে সামান্য কয়েকজনই এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হন। সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী আরিফা সুলতানা। ছয়বার চেষ্টা করে অবশেষে ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
ঝিনাইদহের মেয়ে, স্বপ্নের শুরু মণিরামপুরে
আরিফার শ্বশুরবাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। শিক্ষাজীবনের সূচনা মণিরামপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি ২০০৭ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৪.১৯ পান। এরপর ২০১০ সালে মণিরামপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে অর্জন করেন জিপিএ ৪.৬০। পরে ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে এবং সেখানেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সাফল্যের নেপথ্যে মা, স্বামী ও ভাই
আরিফা বলেন, “আল্লাহর রহমত আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভকামনায় আজকের এই সফলতা। রেজাল্ট দেখে স্বপ্নের মতো লাগছিল। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
মায়ের অনুপ্রেরণাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, “আম্মু নিজে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন, কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। সেই অপূর্ণতা থেকেই আমাদের ছয় ভাইবোনকে সব সময় পড়ালেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তিনি-ই আমাদের অনুপ্রেরণার ভিত্তি।”
বিয়ের পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সহযোগিতা ছিল বলেই তার এই লম্বা যাত্রা সম্ভব হয়েছে। “স্বামী সবসময় বলতেন, ‘তুমি তোমার মতো এগিয়ে যাও, আমি অপেক্ষা করছি।’ এই বাক্যটাই ছিল আমার আত্মবিশ্বাসের উৎস,” বলেন আরিফা।
তার স্বামী রবিউল ইসলাম বলেন, “আরিফা একজন অধ্যবসায়ী মানুষ। আমি শুধু তার হতাশার সময়ে সাহস দিয়েছি। আসল কৃতিত্ব তার প্রজ্ঞা ও অধ্যবসায়ের।”
বিসিএসের স্বপ্নের বীজটা বুনেছিলেন আরিফার বড় ভাই। খুলনা পাবলিক কলেজের সহকারী অধ্যাপক তাকদীরুল গনী বলেন, “ভালো কিছু করতে সময় লাগে। আমরা ছোটবেলা থেকেই তাকে সাহস দিয়েছি। এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস তাকে অনেক সহায়তা করেছে। আজ আমরা খুব আনন্দিত।”
কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মতান্ত্রিক প্রস্তুতি
সংসারের কাজ সামলে, সন্তানকে সময় দিয়ে, আর নিজের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিয়মিত পড়াশোনা করে নিজেকে তৈরি করেছেন আরিফা। বন্ধ রেখেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পরিকল্পিতভাবে সিলেবাস এবং বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে টপিক ধরে বই শেষ করেছেন। নতুন বিষয়গুলো চিহ্নিত করে পড়েছেন ডাইজেস্ট থেকে। প্রতি টপিক শেষে দিয়েছেন মডেল টেস্ট। যেসব জায়গায় দুর্বলতা ছিল, তা আবার নতুন করে রিভিশন দিয়েছেন।
“প্রায় পাঁচ বছরের সন্তান এবং আট বছরের সংসার সামলে প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করেছি। একবারও ভেঙে পড়িনি,” বলেন তিনি।
টানা ব্যর্থতা, তবুও হার না মানা মানসিকতা
টানা পাঁচবার ব্যর্থ হয়েও আশাহত হননি আরিফা। তিনি বলেন, “৩৭তম থেকে ৪৪তম বিসিএস পর্যন্ত ছয়বার অংশ নিয়েছি। প্রথম তিনবার প্রিলিতে বাদ পড়ি। ৪১তম বিসিএসে নন-ক্যাডারে সুপারিশ পাই। এরপর ৪৩তম প্রিলিতেও বাদ। অবশেষে ৪৪তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাই।”
বিসিএস প্রত্যাশীদের প্রতি পরামর্শ
“সফল হতে হলে লক্ষ্য স্থির রাখতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অজুহাত খোঁজা যাবে না, বরং সেগুলো সরিয়ে দিতে হবে। বিসিএস যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, তাই অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছল থাকাটা দরকার। সফলতা নয়, কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য আপনার মানসিক শক্তি বাড়াবে, আত্মবিশ্বাস জোগাবে,” বলেন আরিফা।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
আরিফা সুলতানা চান, তাঁর পেশাগত দায়িত্ব যেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন। পাশাপাশি ঝরে পড়া শিশুদের কল্যাণে কাজ করারও ইচ্ছা তার। তিনি বলেন, “সততাই সেবা। আমি সেই সেবার জায়গাটাই প্রসারিত করতে চাই ঝরে পড়া শিশুদের পাশে থেকে।”
আরিফার গল্পটি শুধুই একজন নারীর নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতিটি স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর জন্য এক অনুপ্রেরণার বার্তা।








