শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যেভাবে ঢাকা হয়ে উঠল মসজিদের শহর

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকাকে ‘মসজিদের শহর’ বলা হয়, কথাটা বহুবার শুনলেও এর পেছনের ইতিহাসটুকু অনেকেরই অজানা। কেন এত মসজিদ ঢাকায়? কিভাবে এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে গেল এক অনন্য ধর্মীয় উপাধি? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কয়েকশ বছর আগে, মুঘল শাসনের সূর্যোদয়ের সময়টিতে।

১৬১০ সাল। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলার শাসনভার দেন সুবাহদার ইসলাম খান চিশতীর হাতে। রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে তিনি ঢাকা (তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর)-কে বানালেন মুঘল বাংলার নতুন কেন্দ্র। ঢাকায় তখনও শহরের রূপ পুরোপুরি নেয়নি, কিন্তু ইসলাম খান এই নগরীর ভিত গড়তে শুরু করলেন পরিকল্পিতভাবে। প্রশাসনিক ভবন, দুর্গ, কাসারকোঠা, সরাইখানা—সবকিছুর পাশাপাশি নির্মিত হতে লাগল মসজিদ। কারণ, ইসলামী শাসনব্যবস্থায় একটি শহরের আত্মা ছিল তার ধর্মীয় স্থাপনাগুলো। ঢাকাও ব্যতিক্রম হলো না।

প্রথম দিকেই নির্মিত হয় ঢাকার অন্যতম প্রাচীন মসজিদ—বিনত বিবির মসজিদ। আজকের ঢাকা মেডিকেল কলেজের পেছনে অবস্থিত এই মসজিদটির নির্মাণকাল ধরা হয় ১৬০৮ সালের দিকে। ইতিহাসবিদদের ধারণা, মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন এক নারী—বিনত বিবি, যার নামেই মসজিদটির নামকরণ। এটি নিছক এক স্থাপনা নয়, বরং নারীর হাতে নির্মিত একটি মসজিদ বলে এটি বাংলার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

ইতিহাসের পাতায় আরও এক উজ্জ্বল নাম—বড় কাটরা মসজিদ। ঢাকার চকবাজারে অবস্থিত এই মসজিদটি নির্মিত হয় সুবাহদার শাহ সুজার শাসনামলে, আনুমানিক ১৬৪৪ থেকে ১৬৪৬ সালের মধ্যে। এটি একটি কাফেলা সরাইখানার অংশ ছিল, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীরা বিশ্রাম নিতেন। এর মধ্যভাগে নির্মিত হয় মসজিদ, যাতে ব্যবসায়ীরা ও পথচারীরা নামাজ আদায় করতে পারেন। এই মসজিদের খিলান, কারুকাজ ও মুঘল স্থাপত্যশৈলী আজও দৃষ্টি জুড়িয়ে দেয়।

এ সময়েই ঢাকায় নির্মিত হয় আরও এক অপূর্ব স্থাপত্য—সাত গম্বুজ মসজিদ, মোহাম্মদপুর এলাকায়। ১৬৪৪ সালে এটি নির্মাণ করেন সুবাহদার শায়েস্তা খানের জামাতা উমিদ খান। নাম শুনেই বোঝা যায়, এর গম্বুজ সংখ্যা সাতটি—তিনটি বড় ও চারটি ছোট। এটি ছিল শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং ছিল এক বিশাল সামাজিক কেন্দ্র, যার পাশে ছিল কবরস্থান এবং আবাসন ব্যবস্থাও। এই মসজিদ যেন সময়কে হার মানানো এক স্মারক।

ঢাকা শহরের অন্যতম প্রতীকী স্থাপনা লালবাগ কেল্লার ভেতরেও রয়েছে একটি প্রাচীন মসজিদ। কেল্লার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুঘল যুবরাজ মোহাম্মদ আজম, সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র। তাঁর শাসনামলে, ১৬৭৮ সালের দিকে, লালবাগ কেল্লার ভেতরে নির্মিত হয় একটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। এটি শুধু দুর্গের সৈন্যদের নামাজের জায়গা ছিল না, বরং তা কেল্লার ধর্মীয় আত্মার প্রতিচ্ছবি।

এমনই এক বিস্ময় জাগানো নাম—বাবু বেগনি মসজিদ। নবাবগঞ্জে অবস্থিত এ মসজিদটির নির্মাতা ছিলেন বাবু বেগনি নামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারী। মসজিদটি ছোট হলেও কারুকার্যে ছিল অনন্য। এটি প্রমাণ করে যে, ঢাকার ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণে নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পুণ্য লাভের ইচ্ছা তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

১৭শ শতকের ঢাকায় শুধু সুন্নি মুসলমানদের জন্য নয়, শিয়া সম্প্রদায়ের জন্যও নির্মিত হয়েছিল ধর্মীয় কেন্দ্র। এর অন্যতম নিদর্শন হোসনি দালান ও তার পাশের মসজিদ। ১৬৪২ সালের দিকে মির মুরাদ নামের এক শিয়া কর্মকর্তা এটি নির্মাণ করেন। আশুরা ও মহররম পালনের কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত হলেও, এই স্থানটি ছিল ধর্মীয় শিক্ষার ও আলোচনার প্রাণকেন্দ্র।

পরবর্তী সময়ে, ১৮শ ও ১৯শ শতকে, ঢাকায় মসজিদের গঠন কিছুটা রূপান্তরিত হয়। তখনকার অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য চিনি মসজিদ বা স্টার মসজিদ। পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত এই মসজিদটির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছিল ১৮শ শতকে। তবে এর মূল রূপ পরিবর্তন হয় ১৯২৬ সালে, যখন আলহাজ্ব বদরুদ্দিন আহমদ মসজিদটির সৌন্দর্য বাড়াতে চীনা সিরামিক টাইলস ব্যবহার করেন। দেয়ালের অলংকরণে বসানো হয় তারা আকৃতির নকশা, যেখান থেকেই এর নাম হয় ‘স্টার মসজিদ’।

এই সব মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এগুলো ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র। মুঘল শাসকরা প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় অন্তত একটি মসজিদ নির্মাণ করতেন। কখনো নিজের নামে, কখনো স্ত্রী-সন্তান বা সেনানায়কের নামে। অনেক স্থানীয় বিত্তবান মুসলিমও এগিয়ে আসতেন। মসজিদের পাশেই থাকত ওয়াকফ সম্পত্তি, পুকুর, কবরস্থান ও মাদ্রাসা। ফলস্বরূপ, ঢাকা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মসজিদের শহর।

পথে-ঘাটে হাঁটলে দেখা যাবে—একেকটা মসজিদ যেন একেকটা গল্প বলছে। কোনটি দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশ বছর ধরে, কোনটি গায়ে বয়ে বেড়াচ্ছে নারী পৃষ্ঠপোষকের নাম, কোনটি শিয়া-সুন্নি ঐক্যের স্মারক। এই শহরের ইট-পাথরের ভিতরে যে আযানের প্রতিধ্বনি এখনো প্রতিদিন প্রতিধ্বনিত হয়, তা শুরু হয়েছিল সেই ১৬০৮ সালে, বিনত বিবির এক নিঃশব্দ অথচ অমর উদ্যোগ দিয়ে।

এইভাবেই ঢাকা পেয়েছে “মসজিদের শহর” উপাধি। এটি কোনো কল্পকথা নয়, বরং ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ এক বাস্তবতা, যা আজও পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে নিঃশব্দে বেঁচে আছে। ইতিহাসের প্রতিটি স্তর জুড়ে মসজিদ হয়ে উঠেছে এই শহরের আত্মা। ঢাকায় আজ যদি হাজার হাজার মসজিদ দেখা যায়, তার বীজ বপন হয়েছিল মুঘলদের হাতে, সযত্নে, গভীর বিশ্বাস নিয়ে। সেই বীজই এখন একটি উপাধিতে রূপ নিয়েছে—মসজিদের শহর।

(লেখিকা: নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পথে প্রান্তরে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ