নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমানে একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে বেড়ে চলেছে একধরনের নিরব মানসিক সংকট। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ—এই আধুনিক যন্ত্রগুলো একদিকে যেমন জ্ঞান অর্জনের পথ খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে শিশুরা এ প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলাফল হিসেবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আচরণগত সমস্যা, একাকীত্ব, অবসাদসহ নানাবিধ মানসিক জটিলতা তাদেরকে গ্রাস করছে।
প্রযুক্তি ও শৈশব: একটি জটিল সম্পর্ক
বর্তমান সময়ে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ আগের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। একসময় যেখানে খেলার মাঠ, গল্পের বই, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ছিল শিশুর জীবনের অঙ্গ, সেখানে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে ডিজিটাল স্ক্রিন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের অধিকাংশ শিশু দিনে গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা মোবাইল বা ট্যাবলেট ব্যবহার করে, যার একটি বড় অংশ ভিডিও দেখা, গেম খেলা বা সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটানোর পেছনে যায়।
অবস্থা এমন হয়েছে যে, অনেক শিশুরা ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই খোঁজে ফোন, আর রাতেও ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেটার সঙ্গেই সময় কাটায়। পিতামাতারা ব্যস্ত থাকায় অথবা সন্তানকে চুপ করানোর সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেন। অজান্তেই শিশুটি প্রযুক্তির নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব
অতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। শিশুরা একাকীত্বে ভুগছে, বাস্তব জীবন থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটালে শিশুরা বাস্তব সম্পর্ক গড়ার দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। এক পর্যায়ে তারা অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে, যা থেকে জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাসের অভাব, ভয়, উদ্বেগ এবং অবসাদ।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম শিশুদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা, আগ্রাসী আচরণ এবং হতাশার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে এই প্রভাব আরও মারাত্মক হয়।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতি ব্যবহারে শিশুদের মধ্যে তুলনামূলক মনোভাব তৈরি হয়। অন্যের জীবনের সুখী ছবি দেখে নিজের জীবনকে মূল্যহীন মনে করার প্রবণতা জন্মায়, যা মানসিক চাপ তৈরি করে।

শারীরিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়ে
শুধু মানসিক নয়, প্রযুক্তি আসক্তি শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় বসে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করলে মোটা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চোখের সমস্যা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা, ঘুমে বিঘ্ন—এই সমস্যাগুলো প্রযুক্তি নির্ভরতায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়।
এছাড়া খেলাধুলার অভাব শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে এবং সামগ্রিকভাবে সুস্থ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

পারিবারিক সম্পর্কে দূরত্ব
এক সময় সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করতেন, খেলা দেখতেন, একে অপরের সঙ্গে সময় কাটাতেন। এখন সে জায়গায় আছে একেকজনের হাতে একেকটি স্ক্রিন। শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে সময় কাটায় মোবাইল গেম বা ইউটিউবে। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশুরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে শেখে কম, আর ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকে শিখে বেশি—যা সবসময় ইতিবাচক নয়।
প্রযুক্তি পুরোপুরি খারাপ নয়
তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া ঠিক নয়। সঠিকভাবে এবং সীমিত ব্যবহারে এটি শিক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। ইউটিউব, বিভিন্ন অ্যাপ, অনলাইন কোর্স বা শিক্ষামূলক গেম শিশুর মেধা ও জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তাই দরকার প্রযুক্তির ‘স্মার্ট’ ব্যবহার। শিশুকে শেখাতে হবে কোন সময় কতটুকু ব্যবহার করবে, এবং কী দেখবে বা খেলবে। এখানে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধানের পথ: কী করা দরকার?
১. সময় নির্ধারণ করে দেওয়া
প্রতিদিন প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, দিনে ১ ঘণ্টা থেকে ১.৫ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম শিশুদের জন্য যথেষ্ট। সময়ের বাইরে কোনো অবস্থাতেই ফোন বা ট্যাব দেওয়া যাবে না।
২. শিক্ষামূলক কনটেন্টে আগ্রহ বাড়ানো
কার্টুন বা গেমের পরিবর্তে শিশুকে ধীরে ধীরে শিক্ষামূলক ভিডিও, গল্প কিংবা সাধারণ জ্ঞানের ভিডিও দেখানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৩. বাস্তব খেলায় উৎসাহ দেওয়া
শিশুকে মাঠে খেলতে পাঠানো, বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করানো এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
৪. পরিবারকে সময় দেওয়া
পরিবারের সকলে একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, ঘুরতে যাওয়া—এগুলো শিশুর মনে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। এতে তারা বাস্তব সম্পর্কে আস্থা পায় এবং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ডুবে যেতে চায় না।
৫. প্রযুক্তির বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা
বিদ্যালয়ে বা কমিউনিটি পর্যায়ে শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। এতে অভিভাবকরা অনুধাবন করতে পারবেন কোন পর্যায়ে সন্তান ক্ষতির দিকে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা, পাঠ্যসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা, সামাজিক বিজ্ঞাপন ও প্রচারে প্রযুক্তি আসক্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা দরকার।
প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকেও শিশুদের জন্য কনটেন্ট তৈরি ও প্রদর্শনে নীতিমালা মানতে বাধ্য করতে হবে। যেমন—রাত ১০টার পর শিশুদের জন্য গেম বা ইউটিউব অ্যাপে অ্যাক্সেস সীমিত করা, কিডস মোডে কেবল নিরপদ কনটেন্ট অনুমোদন দেওয়া ইত্যাদি।
শেষ কথা
শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের যৌথ দায়িত্ব। প্রযুক্তি যেমন উন্নয়নের হাতিয়ার, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার একটি নীরব মানসিক মহামারীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
প্রযুক্তি থেকে বাঁচানো নয়, বরং শিশুদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানোই এখন সময়ের দাবি। শৈশব হোক প্রাণবন্ত, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।








