লেখক: হিমালয় সুমু
প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ স্যার,
(১৯৪৮–২০১২)
আজ আপনার চলে যাওয়ার ১৩তম বছর। ২০১২ সালের এই দিনটিতে আপনি চলে গেলেন এক এমন দেশে, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। অথচ আমরা এখনো প্রতিদিন আপনার কাছে ফিরে যাই—আপনার লেখা পাতায় পাতায়, সংলাপের প্রতিটি ফাঁকে, হিমুর হলুদ পাঞ্জাবির ছায়ায়, মিসির আলির চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, কিংবা শুভ্রর মরমী নিস্পৃহতায়।
আপনি তো শুধু একজন লেখক ছিলেন না—ছিলেন এক শব্দের যাদুকর, যিনি বাংলা ভাষার প্রতিটি অক্ষরে প্রাণ ফুঁকে দিয়েছিলেন। আপনার লেখার ছোঁয়ায় যেন সময় থমকে দাঁড়াত। আমরা হেসেছি, কেঁদেছি, প্রেমে পড়েছি, হারিয়ে গিয়েছি—সব কিছু একসাথে। আপনি পাঠকের হৃদয়ে শুধু সাহিত্য ঢালেননি, ঢেলে দিয়েছেন জীবন, দর্শন আর নিঃশব্দ আবেগ।
আপনার সৃষ্টি হিমু, যে মাটিতে পা রেখে আকাশে হাঁটতে জানে—তার চোখে আমরা দেখেছি এক অদ্ভুত স্বাধীনতার স্বপ্ন। যার কাছে পকেটে টাকা না থাকলেও সে ছিলো হৃদয়ের দিক দিয়ে ধনী, চায়ের কাপে একটা চুমুকেই যে কষ্ট উড়িয়ে দিতে জানে।
মিসির আলি, যিনি যুক্তি দিয়ে জট ছাড়ান, অথচ নিজের জীবনের জট কখনোই খুলে উঠতে পারেন না।
শুভ্র, যে এতটাই পবিত্র যে তার নিঃশ্বাসেও যেন অনন্তের গন্ধ পাওয়া যায়।
আর বাকের ভাই—যার মৃত্যুতে কোটি মানুষ কেঁদেছিলো যেন তিনি কোনো কল্পিত চরিত্র নন, একজন আপনজন।
তিথি, রূপা, নন্দিনী—আপনার নারী চরিত্রগুলো কোনোদিন শুধু প্রেমিকা বা বোন হয়ে থাকেনি; তারা হয়ে উঠেছে ভাবনার রং, জীবনের রূপক।
আপনার লেখা কোথাও কেউ নেই, এই আমি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, আজ রবিবার, বহুব্রীহি, নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, ঘেটুপুত্র কমলা—এসব শুধু উপন্যাস, নাটক বা চলচ্চিত্র নয়, এগুলো যেন সময়ের দলিল।
আপনার সাহিত্যে ছিল ঈর্ষণীয় রকম সরলতা—কিন্তু সেই সরলতার নিচে ছিল গভীর আত্মজিজ্ঞাসা। আপনি মানুষকে বুঝেছিলেন, খুব গভীরভাবে। তাইতো আপনার লেখায় আমাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকা, এমনকি পথের ভিখারিও নিজস্ব এক আলোয় ঝলমল করে।
হুমায়ূন আহমেদ স্যার,
আপনি চলে যাওয়ার পরও বাংলা সাহিত্য থেমে যায়নি ঠিক, কিন্তু তার হৃদয়টা যেন কোথাও ফাঁকা হয়ে গেছে। এখন যারা লিখে, তাদের কলমে শব্দ আছে, কিন্তু হৃদয়ে আপনার মতো ব্যথা নেই, অনুভূতি নেই।
আপনি হয়তো এখন কোনো এক আকাশে বসে আছেন—হিমুকে আর মিসির আলিকে নিয়ে তর্ক করছেন। শুভ্র পাশেই বসে, চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনার চারপাশে হয়তো অনন্তকাল বইছে, আর আপনি এখনও একটা অসমাপ্ত গল্প নিয়ে বসে আছেন, যেখানে আমরা সবাই এখনো চরিত্র হয়ে রয়ে গেছি।
আপনাকে ভীষণ মনে পড়ে স্যার। কখনো রেল লাইনের পাশে হেঁটে যেতে যেতে, কখনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে, কখনো চুপ করে বসে থাকলে, অথবা কোনো অলস রাতে হিমুর মতো নির্বিকারভাবে ভাবতে বসলে।
আপনি চলে যান, ঠিক আছে। কিন্তু আমরা? আমরা এখনো আপনার ফিরে আসার অপেক্ষায়…
— ইতি
ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় ও অশ্রুজলে,
আপনার একজন পাঠক
(একজন নিঃশব্দ হিমু, নিরব শুভ্র, একান্ত মিসির আলি, আর একটুখানি বাকের ভাই)
১৯ জুলাই ২০২৫, ঢাকা
পুনশ্চ: স্যার, হিমুর মধ্যদুপুরে আপনি বলেছিলেন—”যে হারিয়ে যেতে চায়, তাকে হারিয়ে যেতে দিতে হয়।” অথচ আমরা আপনাকে হারিয়ে যেতে দিতে পারিনি, বারবার আপনার পুরোনো লেখাগুলোর পৃষ্ঠা উল্টে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখি। এটুকু অপরাধ ক্ষমা করবেন হুমায়ূন স্যার।








