আফসার রেজা, ক্রীড়া প্রতিবেদক:
নয় বছর—কত কিছু বদলে যায় এই সময়ের ভেতর। কারও চুলে পাক ধরে, কারও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ সীমানা চলে আসে। সময় পেরোয়, স্মৃতি ঝাপসা হয়। কিন্তু অপেক্ষা ঠিক থেকেই যায়। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট দ্বৈরথে সেই অপেক্ষার নাম ছিল ‘একটি জয়’। সেই প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হলো অবশেষে, মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। পারভেজ হোসেন ইমনের ব্যাটে, মোস্তাফিজ-তাসকিনের বল হাতে, পাকিস্তানের বিপক্ষে অবশেষে জয়ের হাসি হাসল বাংলাদেশ—লম্বা নয় বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে।
৯ বছর আগে ২০১৬ সালে এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারানো সেই জয় ছিল মাহমুদউল্লাহদের। আজকের দিনটা পারভেজ হোসেন ইমনদের। সময় বদলে গেছে, নাম বদলে গেছে। তবে চাওয়া ছিল একই—পাকিস্তানের বিপক্ষে একটিমাত্র জয়। আর সেই চাওয়াকেই আজ বাস্তবে রূপ দিল টাইগাররা। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে প্রথম ম্যাচেই ৭ উইকেটের দাপুটে জয়ে ১-০তে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।
ম্যাচের গল্পটা আসলে বোলারদের হাত ধরেই লেখা। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের বিপরীতে যেন আজ এক ঝড় তুললেন তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান। তাসকিনের চোখে আগুন, হাতে বিদ্যুৎ—৩.৩ ওভারে ২২ রানে ৩ উইকেট। আর মোস্তাফিজ? চার ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে ২ উইকেট। এমন কিপটে বোলিং, টি-টোয়েন্টির যুগে রীতিমতো অবিশ্বাস্য। দেশের মাটিতে মোস্তাফিজ আবার প্রমাণ করলেন, কাটারটা এখনও ধারালোই আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে মাত্র ১১০ রানে অলআউট করে দেওয়া মোটেও সহজ নয়। ওপেনার ফখর জামান কিছুটা লড়াই করে, করলেন ৪৪ রান। কিন্তু বাকিরা যেন হাওয়ায় ভেসে গেলেন। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে পাক ব্যাটিং লাইনআপ ছিল যেন নুয়ে পড়া বাঁশবাগান।
কিন্তু ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেও সহজে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই তানজিদ হাসান তামিমের বিদায়। এরপর ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরে গেলেন অধিনায়ক লিটন দাস। দুজনেই ফিরলেন ১ রান করে, দুইজনই ৪ বল খেলে। যেন হঠাৎ করেই নেমে এলো এক চাপা অস্থিরতা—এই বুঝি ম্যাচটা আবারও হাতছাড়া হয়!
ঠিক তখনই দৃঢ় হয়ে উঠলেন দুই তরুণ—তাওহিদ হৃদয় ও পারভেজ হোসেন ইমন। হাল ধরলেন, গড়লেন ৭৩ রানের মূল্যবান জুটি। ইমনের ব্যাটিংয়ে ছিল পরিণত ভাব, ছিল ধৈর্য, ছিল প্রয়োজনীয় আগ্রাসন। ৩৯ বল খেলে ৫৬ রান, ৩টি চার, ৫টি ছক্কা—সত্যিই এক দায়িত্বশীল ইনিংস। তার ইনিংসে যেমন ছিল নির্ভরতা, তেমনি ছিল দর্শকদের জন্য চোখের আরামও।
তাওহিদ হৃদয়ও ব্যাট হাতে কম যান না। ৩৭ বলে ৩৬ রান করে তিনি যেন ইমনের সঙ্গে মঞ্চটা প্রস্তুত করেই দিলেন। হৃদয় আউট হলেও জয়ের দেখা মিলল খুব দ্রুতই। ইমনকে সঙ্গ দিয়ে বাকিটা কাজ সারলেন জাকের আলি অনিক। ২৮ বল হাতে রেখেই জয়—টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এমন দাপুটে পারফরম্যান্স সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
আজকের এই জয় শুধুই একটি ম্যাচের হিসাব মেলানো নয়, বরং, নয় বছরের ক্ষুধার্ত টাইগারদের একটি জয়ের অপেক্ষার অবসান ঘটানো। বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা, গ্যালারিভর্তি দর্শকের গর্জন, আর প্রেসবক্সে নানা হিসাব। সেই আবহ ফিরে এল আজও।
তবে এই জয় যেন শেষ না হয়, বরং শুরু হয় নতুন একটি অধ্যায়ের। পারভেজ হোসেন ইমন, তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান—তাদের হাত ধরে যদি আবারও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট, তবে আজকের দিনটা সত্যিই ইতিহাস হয়ে থাকবে। শুধু নয় বছরের জয় ক্ষুধার সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং নতুন একটি আশার গল্পের শুরু হিসেবে, চলমান সিরিজ জয়ের প্রথম সোপান হিসেবে।








