শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ বছরে ৭ লাখ টন গম আমদানির সমঝোতা স্মারক

শাওন বনিক, স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি পর্যায়ে গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গম রপ্তানিকারক সংগঠন ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে এ লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ খাদ্য অধিদপ্তর এ চুক্তি সম্পাদন করে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে ৭ লাখ টন উচ্চমানের গম আমদানি করা হবে। আজ রোববার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বাক্ষর করেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর ও ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ কে সওয়ার।

চুক্তি শেষে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, “এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বাণিজ্য সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা উভয় দেশের জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে।”

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি গম আমদানি কেন?

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসে। এর জেরে বাংলাদেশ সরকার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং আমদানি ভারসাম্য তৈরি করতে সরকারি উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এত দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা গম প্রধানত ছিল সাহায্যভিত্তিক।

সরকারি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির এই উদ্যোগ বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসের কৌশলেরই অংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দাম দিয়েও গম আমদানিতে আগ্রহী বাংলাদেশ, যার আনুষ্ঠানিকতা আজকের চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হলো।

বৈঠক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী ধরনের পণ্য আমদানি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব, তা নির্ধারণে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আগামী ২২ জুলাই মঙ্গলবার আমেরিকান অ্যাপারেলস অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের (AAFA) সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক হবে। এরই মধ্যে শেভরন, এক্সিলারেট এনার্জি, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল, ইউএস কটন অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল।

শুল্ক সংকট ও কূটনৈতিক তৎপরতা

আগামী ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার কার্যকর হলে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ৫০ শতাংশ (বিদ্যমান ১৫% + নতুন ৩৫%)। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আবারও যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবে। তবে এখনো তৃতীয় দফা আলোচনার নির্দিষ্ট তারিখ পায়নি বাংলাদেশ। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, আলোচনার সময় চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় অনুরোধ জানানো হবে।

বাণিজ্যঘাটতির বর্তমান চিত্র

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে আমদানি হয়েছে মাত্র ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য। এর আগের অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৭৬৮ কোটি ও আমদানি ছিল ২৬২ কোটি ডলার। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে প্রধান হলো তৈরি পোশাক; আর আমদানিকৃত প্রধান পণ্য স্ক্র্যাপ লোহা।

ভবিষ্যৎ আমদানির পরিকল্পনা

গম ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভোজ্যতেল, তুলা, এলএনজি এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ভারসাম্য আনবে বলে সরকার মনে করছে।

শুল্কনীতি ও সতর্কতা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য আনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৯০টি পণ্যের শুল্কহার শূন্য করেছে এবং আগামী বাজেটে আরও ১০০ পণ্য অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই সুবিধা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্যান্য দেশও পাবে—কারণ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য এককভাবে শুল্কছাড় দেওয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “বাণিজ্য কৌশল একমুখী হওয়া উচিত নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর একতরফাভাবে শুল্ক বাড়িয়ে বাণিজ্য চাপ সৃষ্টি করায় WTO-এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান ডলার সংকটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চ দামে গম আমদানি এবং অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক থাকা উচিত।”

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ বছরে সরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ টন গম আমদানির চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তবে অর্থনীতিবিদরা এই ধরনের আমদানিতে সচেতন ও বহুমুখী কৌশলের পরামর্শ দিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ