সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের সখীপুরে অতিরিক্ত মদ্যপানে মোস্তাফিজুর রহমান রুবেল (৫০) নামে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে। তবে এ মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। পরিবার ও বিএনপির স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করছেন, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে মদ্যপান করিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ ও চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণে হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (১৮ জুলাই) ভোরে। টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সখীপুর পৌর শহরের একটি মার্কেটে তাঁকে অচেতন ও আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। রাতেই তাঁকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়।
মোস্তাফিজুর কাকড়াজান ইউনিয়নের বড়বাইদপাড়া গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেন দুলালের ছেলে এবং সখীপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি সপরিবারে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করতেন।
রাতের ঘটনার বর্ণনা:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোস্তাফিজুর মোটরসাইকেলে বাসা থেকে বের হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সখীপুর বাজারের একটি মার্কেটে গিয়ে ঢোকেন। সেখানকার নৈশ প্রহরী শাহআলম জানান, তিনি তাঁকে মদ্যপ ও আহত অবস্থায় দেখতে পান এবং শরীরের রক্ত মুছে দিয়ে চলে যান।
পরে এক টেইলার্স দোকানে গিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন মোস্তাফিজুর। দোকানের মালিক বাচ্চু মিয়া পরিস্থিতি শান্ত করতে চাইলে, তাঁকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় চলে যান। সেখানেও মোস্তাফিজুর দরজা-জানালা ভাঙার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
সখীপুর থানার এসআই লিবাস চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে গিয়ে মোস্তাফিজুরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়, তবে পথেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
পরিবার ও দলের বক্তব্য:
রুবেলের বাবা বলেন, “আমরা কারো বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করছি না, তবে ছেলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তের ভিত্তিতেই সত্য জানা জরুরি।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সাজু বলেন, “রুবেল দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মী ছিলেন। আমরা ধারণা করছি, কেউ তাঁকে নির্যাতন করে বা মাদক খাইয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”
চিকিৎসকদের মত:
সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. শামসুল আলম ও ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সামী জানান, মোস্তাফিজুর মদ্যপ অবস্থায় হাসপাতালে আসেন এবং তাঁর শরীরে বেশ কিছু যখম ছিল। অসংলগ্ন কথাবার্তার কারণে তাঁকে ওয়াশ দেওয়া হয়, তবে পরে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের ধারণা, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য:
সখীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, “আমরা মোস্তাফিজুরকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করি এবং হাসপাতালে নেই। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শরীরে কিছু আঘাতের চিহ্ন ছিল, তবে প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তেই জানা যাবে।”
এ ঘটনায় পুলিশ এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
মৃত্যু রহস্যে ঘেরা:
মোস্তাফিজুরের মৃত্যু শুধুমাত্র অতিরিক্ত মদপানজনিত হার্ট অ্যাটাক, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে—তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সবদিক বিবেচনায় এনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা।








