মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নেপালের জালে সাগরিকার ৪ গোল, রাজকীয়ভাবে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

আফসার রেজা, ক্রীড়া প্রতিবেদক:

দর্শকদের চোখের সামনে যেন এক নিখুঁত চিত্রনাট্য। মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, আলোর রোশনী সাগরিকার পায়ে গিয়ে থেমেছিল। তাঁর প্রত্যাবর্তনটা যে এমন রূপকথার মতো হবে, তা কে জানত!

কিংস অ্যারেনার গ্যালারিতে তখন ঢেউ খেলে যাওয়া উল্লাস।
আর মাঠে?
মাঠে একাই বাজিমাত করছেন মোসাম্মৎ সাগরিকা।
নেপালের বিপক্ষে অলিখিত ফাইনালে চার গোল করে শুধু ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টটাই নিজের নামে লিখে নিয়েছেন ১৭ বছরের এই ফরোয়ার্ড।

একটি ম্যাচে চার গোল।
পুরো আসরে মাত্র তিন ম্যাচে আট গোল। এই সংখ্যা দিয়ে হয়তো তাঁর কীর্তিকে মাপা যাবে না। কারণ আজকের ম্যাচে সাগরিকা শুধু গোল করেননি, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ছন্দ, স্পন্দন এবং নিঃসন্দেহে—নায়িকা।

নায়িকার প্রত্যাবর্তন:

টুর্নামেন্টের শুরুর তিন ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে দর্শক হয়ে থাকতে হয়েছিল সাগরিকাকে। তাঁকে ছাড়াও বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আক্রমণে ছিল না ধার, ছিল না রোমাঞ্চ।

আজ সেই সাগরিকা ফিরলেন। আর ফিরেই যেন বলে দিলেন—”আমাকে ছাড়া ফুটবল না খেললেই নয়!”

সাত মিনিটেই প্রথম গোল। নেপালের রক্ষণে তখনও কোনো ফাঁক ছিল না, কিন্তু সাগরিকার পা থেকে বের হওয়া বল যেন হাওয়ার পথ বুঝে খুঁজে নিল জালের ঠিকানা।
আর এরপর একের পর এক…
৫১ মিনিটে জাদুকরি ড্রিবল, ৫৮-তে হ্যাটট্রিক, ৭৭-এ পুঙ্খানুপুঙ্খ ফিনিশিং। ৭১ মিনিটে অফসাইডে না পড়লে পাঁচ নম্বর গোলটাও হয়তো উঠত নামের পাশে।

গোলের গল্পের বাইরে:

এই দলটার নাম ‘অনূর্ধ্ব–২০’ হলেও তাঁদের খেলা ছিল পরিণত, রীতিমতো ‘ম্যাচিউরড’। কোচ পিটার বাটলারের কৌশলে ছিল আক্রমণাত্মক ভারসাম্য। চার ফরোয়ার্ড নিয়ে সাজানো একাদশে সাগরিকার সঙ্গে ছিলেন নবীরণ, উমেলা, পূজা।
মাঝমাঠে বরাবরের ভরসা—মুনকি ও স্বপ্না। তাঁদের পেছনে ছিল নিশ্চিত এক দেয়াল—রক্ষণের শান্তি-ঐশী আর পোস্টে মিলি আক্তার।

প্রথম দশ মিনিটেই বাংলাদেশ আক্রমণের তীব্রতা বুঝিয়ে দিয়েছিল—আজ কিছু একটা বিশেষ ঘটতে যাচ্ছে।

শেষ বাঁশিতে উচ্ছ্বাস:

টুর্নামেন্টের নিয়ম ছিল ডাবল লিগ পদ্ধতির। কাগজে-কলমে তাই ফাইনাল ছিল না, কিন্তু বাস্তবে আজকের ম্যাচটাই হয়ে উঠেছিল ‘অলিখিত ফাইনাল’।

সমীকরণ ছিল সহজ—ড্র করলেই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন।
কিন্তু সাগরিকা ও তাঁর সতীর্থরা কোনো হিসাব-কিতাবে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা খেলেন হৃদয় দিয়ে, খেলে যান ঝড় তুলে।

৪-০ গোলের একতরফা জয়ে বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলল সর্বোচ্চ ১৮ পয়েন্ট। নেপাল থাকল অনেক দূরে—১২-তে।

একটি সময়ের পেছনের গল্প:

মাত্র কিছু মাস আগে, দেশের নারী ফুটবলে ঝড় উঠেছিল।
কোচ ও খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহ, অনিশ্চয়তা।
সে অন্ধকারের ভিতর থেকে আবার আলো খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ।

পিটার বাটলার এসে নতুন করে দল সাজিয়েছেন। র‌্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোকে হারিয়ে যেমন এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে বড়রা,
ঠিক তেমনি ঘরের মাঠে ছোটরাও ধরে রেখেছে আত্মবিশ্বাস আর জয়ধ্বজা।

ইতিহাসের পাতায় আরও একবার:

এই নিয়ে পঞ্চমবার চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।
২০১৮, ২০২১, ২০২৩—এবার ২০২৪–এও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখল। মাত্র একবার, ২০২২-তে ভারতের মাঠে পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। তখন গোলপার্থক্যের ভিত্তিতে ভারতকে দেওয়া হয়েছিল শিরোপা।

আজ সে হিসেবও যেন চুকিয়ে দিল এই দলটা। পুরো টুর্নামেন্টে ছয় ম্যাচ, ছয় জয়। গোল করল ৩৪টি, হজম করল মাত্র ২টি।

এবং সাগরিকা…

তাঁর খেলা দেখে বোঝা যায়, বয়স কেবল একটা সংখ্যা মাত্র। ১৭ বছরের এই কিশোরী অনেকের চেয়ে অনেক পরিণত, অনেক সৃজনশীল। তাঁর পায়ে জাদু আছে, চোখে লক্ষ্য আছে, আর হৃদয়ে আছে দেশের প্রতি নিখাঁদ ভালোবাসা।

সাগরিকার জন্য হয়তো এখন আফসোস—‘ইশ! যদি নিষেধাজ্ঞায় না থাকতে হতো…’
তবু যা করেছেন, তা দিয়েই তিনি আজ কিংস অ্যারেনায় রাজত্ব করলেন।

এই রাজত্বের নাম “বাংলাদেশ”।
আর রাণী—সাগরিকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ