শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দৃশ্যটা এমনও হতে পারতো…

হিমালয় সুমু:

দিনটা অদ্ভুত রকমের শান্ত ছিল।

আকাশ ছিল নীল, একদম সাদা কাগজের মতো পরিষ্কার। রোদ ছিল, কিন্তু তেতে ওঠা নয়—একটা মোলায়েম আলো, যেটা শরীরে পড়লে ক্লান্তির বদলে ঘুম পায়।

মাইলস্টোন কলেজের মাঠে তখন বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছে, খেলছে।
তারা কেউ ক্লাস সিক্সে পড়ে, কেউ সেভেনে। স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।
তাদের চোখে বিস্ময়, মুখে একরাশ শিশুসুলভ হাসি।

হঠাৎ কেউ একজন বলে উঠল,
— “ওই দেখো, প্লেন!”

সবাই একসঙ্গে আকাশের দিকে তাকাল।
একটা সাদা রঙের ট্রেনিং বিমান, মেঘের ফাঁক গলে উড়ে যাচ্ছে।
আকাশে সে প্লেন যেন এক টুকরো স্বপ্ন হয়ে উড়ছিল।
একটা ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুকে বলে,
— “আমি বড় হয়ে পাইলট হবো!”

সবার মুখে তখন হাসি।
একটা নরম দুপুর, কিছু স্বপ্নবাজ চোখ আর উড়তে থাকা একটা বিমান—
এমন দৃশ্য দেখে কারো মন খারাপ হয় না।
হত না…

কিন্তু ঠিক তখনই দৃশ্যটা বদলে গেল।
একটা শব্দ হলো—বিস্ফোরণের মতো।
তারপর আগুন।
তারপর ধোঁয়া।
তারপর চিৎকার।

হাসির শব্দগুলো থেমে গেল।
আকাশের দিকে হাত তুলে রাখা শিশুগুলোর চোখে ভয় চলে এল।
বিমানটা আর স্বপ্ন হয়ে থাকল না।
ওটা হয়ে উঠল দুঃস্বপ্ন।

বিধ্বস্ত ট্রেনিং বিমানটা কলেজ ভবনের ওপর পড়ল।
তাদের প্রিয় ক্লাসরুম, প্রিয় করিডোর, টিফিন খাওয়ার জায়গা—সব যেন মুহূর্তে ছাই হয়ে গেল।
ছোট ছোট ব্যাগ, টিফিন বক্স, বইয়ের পাতা, জুতা ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মাঝে।
বাচ্চারা যে যার মতো দৌড়াচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ চুপ করে বসে আছে এক কোণে, থরথর করে কাঁপছে।
আর যারা কিছু বলতে পারছে না, তারা পড়ে আছে নিথর হয়ে।

একটু দূরেই একটা চায়ের দোকানে বসে ছিল এক বয়স্ক মানুষ—
সবাই তাকে চাচা বলে ডাকে।
সারাদিন পত্রিকা পড়ে আর খরুচে গল্প করে।
বিমানের শব্দ শুনে ছুটে এলো কলেজের দিকে।
চোখের সামনে শুধু ধোঁয়া আর ধ্বংস।
চাচা তখন মাটিতে বসে পড়ল।
নিজের ছেলেকে হারানোর পর থেকে কখনো চোখে জল আসেনি তার।
কিন্তু সেদিন সে কান্না থামাতে পারেনি।

একটা দৃশ্য, একটা মুহূর্ত, আর সব পাল্টে গেল।

পরদিন পত্রিকায় এক সারির একটা ছবি ছাপা হয়—
ছোট্ট একজোড়া জুতা, পাশে পোড়া একটা বই।

শিরোনাম লেখা: “দৃশ্যটা এমনও হতে পারতো…”

আর নিচে ছোট করে লেখা—
“আকাশে উড়তে থাকা প্লেনটা যদি একটু তাড়াতাড়ি ঘুরে যেত,
যদি কোনো ক্লাসরুম না থাকত সেদিকে,
যদি একটু সময় থাকত…
তাহলে হয়তো কেউ একজন আজও বলত—
‘আমি বড় হয়ে পাইলট হবো।’”

হে আল্লাহ, তুমি আমাদের এই প্রজন্মকে রক্ষা করো।

তাদের হাসি, তাদের স্বপ্ন যেন কখনো আগুনে পুড়ে না যায়।

আমরা কেবল দেখতে চাই—
একটা নিরাপদ আকাশ,
একদল বাচ্চা আঙুল তুলে বলছে—
“ওই দেখো, প্লেন!”

“আমি বড় হয়ে পাইলট হবো”
আর আকাশজুড়ে শান্তি,
শুধু শান্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ