ফিরোজ রেজা, স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে—স্বাধীন দেশের আকাশ নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। সেই যাত্রায় অনেক অর্জন, অনেক সাহসিকতার গল্প আছে। তবে, প্রতিটি অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কিছু ব্যর্থতা, কিছু শোকগাথা, কিছু অপ্রকাশিত বেদনার ইতিহাস। গত ৩৪ বছরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ৩২টিরও বেশি বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঘটেছে প্রশিক্ষণের সময় এবং যার প্রত্যেকটি কেবল যন্ত্রপাতি হারানোর ট্র্যাজেডি নয়, বরং দক্ষ, প্রশিক্ষিত, সাহসী পাইলটদের অকালপ্রয়াণের হৃদয়বিদারক স্মৃতি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক যে বিষয়টি উঠে আসে তা হলো—বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ প্রশিক্ষণ চলাকালে ঘটে। পিটি-৬, ইয়াক-১৩০, এল-৩৯ কিংবা এফ-৭ যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলেও দুর্ঘটনায় বারবার এই মডেলগুলোর নামই উঠে আসে। এই তথ্য ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে একদিনেই ৪৪টি বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছিল। এমন ভয়াবহ ক্ষতি আর হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরায় সংঘটিত দুর্ঘটনা এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে—যেখানে একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান আকাশ থেকে নেমে এসে সরাসরি বিধ্বস্ত হয়েছে একটি স্কুল ভবনের উপর, প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীর।
আমার এই লেখায় ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর উল্লেখযোগ্য বিমান দুর্ঘটনাগুলোর তালিকা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো, যাতে ভবিষ্যতের জন্য আমরা আরও সচেতন হই এবং সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।
১. ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ট্র্যাজেডি:
১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় কেবল উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবন ধ্বংস করেনি, সেই সঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি করেছিলো সামরিক অবকাঠামোর। একদিনেই ৪০টি এফ-৬ যুদ্ধবিমান ও ৪টি মিল-৮ হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়ে যায়। এটি ছিল বিমান বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা। যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার হারানোর ফলে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছিল।
২. প্রশিক্ষণেই প্রাণহানি: যাদের ফেরা হয়নি:
প্রশিক্ষণের সময়ই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে পিটি-৬, এল-৩৯, ইয়াক-১৩০, এফটি-৬, কে-৮ডব্লিউ ধরনের বিমানগুলোর নামই বেশি আসে। কিছু উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা:
- ২০ ডিসেম্বর ২০১০: পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান বরিশালে বিধ্বস্ত হয়ে দুইজন স্কোয়াড্রন লিডার নিহত হন।
- ২৪ এপ্রিল ২০০৬: পিটি-৬ ট্রেনিং বিমান কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহে বিধ্বস্ত হয়, ফ্লাইট ক্যাডেট তানজুল ইসলাম নিহত হন।
- ৯ এপ্রিল ২০০৭: পিটি-৬ বিধ্বস্ত হয়ে যশোরে ফ্লাইট ক্যাডেট ফয়সাল মাহমুদ নিহত হন।
এই দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে কখনও যান্ত্রিক ত্রুটি, কখনও আবহাওয়াগত সমস্যা, আবার কখনও পাইলটের ত্রুটি দায়ী হিসেবে উঠে এসেছে।
৩. যুদ্ধবিমানের দুর্ঘটনা: মহড়া থেকে মৃত্যুর মুখে:
যুদ্ধবিমানগুলো প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সেগুলোর কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা না বললেই নয়:
- ২৩ নভেম্বর ২০১৮: এফ-৭ বিজি যুদ্ধবিমান টাঙ্গাইলে রকেট ফায়ারিং অনুশীলনের সময় বিধ্বস্ত হয়, পাইলট নিহত।
- ৮ এপ্রিল ২০০৮: টাঙ্গাইলের পাহাড়িয়া গ্রামে এফ-৭এমবি বিধ্বস্ত হয়ে স্কোয়াড্রন লিডার মোরশেদ নিহত হন।
- ৩০ জুলাই ২০০২: চট্টগ্রামে এ-৫সি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট আদনান প্রাণ হারান।
- ১৯৯৩: দুটি পিটি-৬ ট্রেনিং বিমানের সংঘর্ষে তিনজন পাইলট প্রাণ হারান।
৪. হেলিকপ্টার ট্র্যাজেডি:
বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বারবার। এরমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা:
- ২ জানুয়ারি ২০১৮: মিল এমআই-১৭ হেলিকপ্টার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বিধ্বস্ত হয়, কুয়েতি সামরিক কর্মকর্তাও এতে ছিলেন।
- ২১ জুলাই ২০১৫: এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জরুরি অবতরণকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ১৯ অক্টোবর ২০০২: কক্সবাজার উখিয়ায় এমআই-১৭-২০০ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে চারজন নিহত হন।
৫. সাম্প্রতিকতম ট্র্যাজেডি: ২০২৪ ও ২০২৫:
- ৯ মে ২০২৪: ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বিধ্বস্ত হয়, স্কোয়াড্রন লিডার মুহাম্মদ আসিম জাওয়াদ নিহত হন।
- ২১ জুলাই ২০২৫: উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রায় ২৭ শিক্ষার্থী (সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী) প্রাণ হারান, যা দেশের সামরিক ও বেসামরিক পরিসরের জন্য এক ভয়ানক বার্তা।
৬. পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ:
- ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২টি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে।
- কমপক্ষে ৫৫ জনের বেশি পাইলট, প্রশিক্ষক, ক্যাডেট ও বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
- সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান সংক্রান্তভাবে।
- প্রতি ২-৩ বছর অন্তর অন্তর বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা নির্দেশ করে যে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা মান এখনো অর্জিত হয়নি।
৭. কী করা প্রয়োজন?
১. প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন: পুরনো বিমান দিয়ে প্রশিক্ষণ না চালিয়ে আধুনিক সিমুলেটর ও উন্নত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি।
২. যান্ত্রিক ত্রুটি প্রতিরোধে রক্ষণাবেক্ষণ: বিমানের রুটিন মেইন্টেন্যান্স ও যাচাই-বাছাই পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
৩. দুর্ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রতিবেদন প্রকাশ: প্রতিটি দুর্ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া সহজ হবে।
৪. পাইলটদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা: প্রশিক্ষণের মানসিক চাপ মোকাবিলায় পাইলটদের কাউন্সেলিং ও মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।
শেষকথা:
প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে শুধুই যান্ত্রিক ত্রুটি বা আবহাওয়া নয়, বরং একেকটি ঘটনা একেকটি পরিবারে নেমে এসেছে চিরস্থায়ী অন্ধকার। তাদের অশ্রু, তাদের অভিশপ্ত দিনগুলো কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। বিমান বাহিনীর এ রক্তাক্ত ইতিহাস স্মরণ করে আমরা চাইব—এই দুঃখের অধ্যায় আর না বাড়ুক। দক্ষ পাইলটেরা যেন আর অকালে প্রাণ না হারান, প্রশিক্ষণ যেন মৃত্যুর পথ না হয়। রাষ্ট্র ও সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এই মর্মান্তিক অধ্যায় রোধ করা সম্ভব। আর সবার আগে প্রয়োজন একটি প্রশ্নের জবাব খোঁজা—‘কেন বারবার এই আকাশে আগুন নামে?’








