হিমালয় সুমু, পথে প্রান্তরে:
২১ জুলাই ২০২৫। সে দিনও সকালটা অন্য দিনের মতোই ছিল।
আকাশে সূর্য উঠেছিল যথারীতি, পাখিরাও তাদের ছানাদের ডেকে তুলেছিল।
কিন্তু কে জানত—সেই দিনের দুপুরটা হয়ে উঠবে এক শিশুর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নিঃসঙ্গ সময়?
ওহি—মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির ছোট্ট এক শিক্ষার্থী। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায় প্রতিদিন, আর ফেরে সেই মায়ের হাসিমুখ দেখে।
(২১ জুলাই) সোমবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
মা আফসানা প্রিয়া তাকে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দিয়ে বসেছিলেন অভিভাবক কক্ষে।
বাচ্চারা ক্লাস করে, মা-বাবারা অপেক্ষা করেন। যেন এক নিরব প্রতীক্ষা—ভরসা আর ভালোবাসার।
ক্লাস শেষে ছোট্ট ওহি ছুটে এসে বলেছিল,
“মা, আমার ব্যাগটা ক্লাসরুমে রয়ে গেছে ভেতরে।”
প্রিয়া হেসে বলেছিলেন,
“তুই দাঁড়া, আমি নিয়ে আসছি।”
সেটাই ছিল প্রিয়ার শেষ কথা, শেষ হাঁটা, শেষ হাসি।
প্রিয়া যখন ক্লাসরুমে ঢুকলেন ঠিক সেই সময় ঘটে গেল বিভীষিকা।
আকাশ থেকে ছুটে আসা এক বিধ্বস্ত বিমান এসে আছড়ে পড়ল স্কুল ভবনের ওপর।
আগুন, চিৎকার, ধোঁয়া, আর ছুটোছুটি।
অভিভাবকেরা ছুটলেন সন্তানদের খোঁজে।
ছেলেকে পাওয়া গেল—ওহিকে।
কিন্তু মা?
মা নেই।
ওহি হাঁ করে চেয়ে ছিল আকাশের দিকে।
মা তার ফেলে আসা স্কুল ব্যাগ আনতে ক্লাসরুমে গিয়েছিল, সে তো এখনো ফেরেনি।
চার দিন পেরিয়ে গেল—প্রিয়া ফেরেননি।
একজন মা কীভাবে নিখোঁজ হন?
কারো জানা ছিল না।
শেষ পর্যন্ত ডিএনএ রিপোর্ট এল আজ বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই)।
১১টি দেহাংশ, ৫ জন নারী।
তাদের মধ্যে একজন—ওহির মা।
আফসানা প্রিয়া।
সেই মা, যিনি প্রতিদিন ছেলেকে স্কুলে আনতেন, ভালোবাসতেন, আগলে রাখতেন।
আজ তার খোঁজ মিলল একটি নমুনায়, এক চিহ্নহীন দেহে।
ওহির বাবা ওহাব মৃধার ভাই দুলাল মৃধা নিশ্চিত করলেন,
“হ্যাঁ, প্রিয়া… আমাদের প্রিয়া আর নেই।”
প্রিয়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মেদিয়াশুলাই গ্রামের মেয়ে।
সেই গ্রামের আকাশেও হয়তো আজ নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নীরবতা।
একজন মা, যিনি শুধু ছেলের স্কুল ব্যাগ আনতে গিয়েছিলেন,
ফিরলেন না, আর কোনোদিন ফিরবেন না।
প্রিয় পাঠক,
মৃত্যুর গল্প আমরা কতটা বুঝি?
একটা ছোট্ট স্কুল ব্যাগ, একজন মা, আর এক শিশুর চোখে হারিয়ে যাওয়ার বিস্ময়—
এর চেয়ে বড় গল্প আর কি হয়?
আজ ওহির স্কুলব্যাগ নিশ্চয়ই সাজানো থাকে ঠিকই।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য জিনিস—
মা—সে আর নেই।
আকাশ হয়তো আজও শান্ত।
কিন্তু এক শিশুর হৃদয়ে, সেখানে প্রতিদিনই ঝড় বয়ে যায়।
একটা স্কুল ব্যাগ আনতে গিয়েছিল মা…
আর সে-ই তো ফেরেনি আর।








