ফিরোজ রেজা, পথে প্রান্তরে:
গাজায় এখন আর মৃত্যু আশ্চর্যের কিছু নয়। এটা যেন একটা দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে উঠেছে। মৃত্যু হাঁটে রাস্তায়, ওড়ে আকাশে, ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও। একটা লোক পানি খুঁজতে বের হলো—সে ফিরবে কিনা, কেউ জানে না।
গাজায় পানি খুঁজতে গিয়ে মারা যায় মানুষ। পানি সরবরাহ করতে গিয়ে মারা যায় মানুষ। পানি পান করেও মারা যায় মানুষ। এমনকি সমুদ্রে একটু স্বস্তির খোঁজে গিয়েও মারা যায় মানুষ।
একজন মানুষ, যিনি লিখতেন, যিনি স্বপ্ন দেখতেন—তিনি এখন বলেন, “গাজায় মৃত্যুর এত পথ, তবু একটা পথও আমরা নিজেরা বেছে নিতে পারি না। কেউ মারা যায় বোমায়, কেউ স্নাইপারের গুলিতে, কেউ ক্ষুধায়।”
একটা পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গাজায় কমপক্ষে ১১৬ জন মারা গেছে অপুষ্টিতে— যার বেশিরভাগই শিশু।
গাজার শিশুরা এখন আর খেলনা চায় না, তারা পানি চায়।
এবং সেই পানিও এখন একেকটা মৃত্যু-ফাঁদ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার পানি অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। ৮৫ শতাংশর বেশি পাইপলাইন, কূপ, শোধনাগার এখন অকেজো। মেরামতের জন্য যন্ত্রাংশ আসতে পারে না। যা ছিল, তাও ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলী বাহিনী—গুদামঘরে ঢুকে ঢুকে।
আর যারা কাজ করছিলেন—পানি ঠিক করছিলেন, মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন—তাদের হত্যা করা হয়েছে।
পানি এখন শুধু একটা উপাদান নয়, এটা এখন এক রক্তমাখা শব্দ।

২১ জুলাই, গাজার রিমাল এলাকায় একটা পানিশোধনাগারে হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে করে পাঁচজন মারা যান সেখানেই। এই শোধনাগারটি ছিল গাজার শেষ আশ্রয়গুলোর একটি।
মানুষ এখন প্রতিদিন পানি খুঁজতে বের হয়। প্লাস্টিকের জার হাতে নিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায়। কেউ কেউ পানি বিক্রি করে—চড়া দামে, যেটা অধিকাংশের সাধ্যের বাইরে।
১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে, ১১ জন মানুষ মারা গেল—
যখন তারা লাইনে দাঁড়িয়েছিল পানি নেওয়ার জন্য।
তাদের মধ্যে সাতজন ছিল শিশু। এই ঘটনা যে লেখক লিখছেন, তার বাসার কাছেই ঘটেছে। এই পৃথিবীতে এমন কোনো নিয়ম নেই, যেখানে শিশুদের পানির জন্য প্রাণ দিতে হয়।
আর যখন পানি পাওয়া যায় না, তখন মানুষ খায় কূপের দূষিত পানি। সেই পানিতে আছে ব্যাকটেরিয়া, রাসায়নিক, আর আছে মৃত্যু।
লেখক নিজেই একবার সেই পানির শিকার হয়েছিলেন।
হেপাটাইটিস A হয়ে গিয়েছিল তার। তার চোখ হলুদ, ত্বক হলুদ— খাবার মুখে উঠতো না, জ্বর ও বমি দেহ ভেঙে দেয়। পেটের যন্ত্রণায় তার মনে হতো, কারো অদৃশ্য হাত তার নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলছে ধীরে ধীরে।
চিকিৎসা?
একটা ব্যথানাশক আর একটা “সালামতেক”। এই ছিল হাসপাতালের সহানুভূতি। তিনি বেঁচে যান। কিন্তু অনেকেই তা পারে না।
এখন গ্রীষ্ম—ভয়ানক গরম। লোকে ভাবে, হয়তো সমুদ্র একটু স্বস্তি দেবে। কিন্তু গাজার সমুদ্র এখন নিষিদ্ধ। সেখানে যাওয়া মানেই গুলির মুখে পড়া।
আগেও এমন ছিল। জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে মারা যেত।
জাতিসংঘ বলেছে, ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ২০০ জন জেলে মারা গেছে। তারপর আরও কতজন গেছে, কেউ জানে না।
আর এই দিকে, উত্তর দিকে, ঠিক কিছু কিলোমিটার দূরে—ইসরায়েলিরা সেই একই সমুদ্রের ঢেউয়ে গা ভাসায়।
তারা সাঁতার কাটে, রোদ পোহায়, দৈনিক গড়ে ২৪৭ লিটার পানি ব্যবহার করে।
আর গাজার মানুষ? তারা দৈনিক পায় ২ থেকে ৯ লিটার—সর্বোচ্চ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের জন্য দৈনিক ১০০ লিটার পানি দরকার।
তাহলে?
তাহলে গাজার মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে?
এই একটি পানি নিয়েই যত কথা বললাম, জীবনের বাকিগুলোও তেমনি ভেঙে পড়েছে— খাবার নেই, বিদ্যুৎ নেই, ওষুধ নেই। বেঁচে থাকাটা এখন একান্তই এক লড়াই।
কোনো শান্তি নেই, নেই কোনো ছোট্ট স্বস্তিও।
লেখক বলেন, “আমি আজও বুঝতে পারি না— এই বিশাল পৃথিবীতে, যেখানে এত মানুষ, এত সভ্যতা,
সেখানে আমরা এখনো কেন পানিও পাচ্ছি না।”
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল— গাজায় চলছে গণহত্যা। তারা বলেছিল, পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পানি থেকে বঞ্চিত করেই মানুষকে মারা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে ক্ষুধা, পানিশূন্যতা আর রোগে, এখনো মারা যাচ্ছে।
আরও কতজন মরছে, কে জানে!!
কারণ গাজার স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের নাম আর লিখে রাখতে পারে না।
এই কথাগুলো লুকোনো নেই। সব প্রকাশিত। টেলিভিশনে, সামাজিক মাধ্যমে। তবুও বিশ্ব চুপচাপ।
শেষে লেখক শুধু একটিই কথা বলেন—
“এই বিশ্বের নীরবতাই এখন আমাদের ওপর পড়া বোমার চেয়েও বেশি গর্জে ওঠে।
এখনই কিছু করো।
না হলে ইতিহাসে তোমরা থাকবে হত্যাযজ্ঞের সহযোগী হিসেবে—
একে পাশ কাটানো যাবে না।”
মূল লেখক: আহমাদ আবুশাওয়িশ, গাজার একজন লেখক ও অধিকারকর্মী।








