রুবেল ভুঁইয়া, পথে প্রান্তরে:
চাঁদপুর, মাওয়া ঘাট কিংবা বরিশালের ইলিশ সবার মুখে মুখে থাকলেও মেঘনার পাড়ের লক্ষ্মীপুরের নাম অনেকের কাছেই এখনো অপরিচিত। অথচ, এ জেলার রামগতি, মজু চৌধুরীর ঘাট, রায়পুরের জেলেরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণ করছেন মেঘনা নদী থেকে। এখানকার ইলিশ জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা অঞ্চলে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশের ইলিশের সবচেয়ে বড় উৎস পদ্মা নয়, বরং মেঘনা অববাহিকা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)–এর ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের গবেষকেরা।
তাদের গবেষণা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Publishing Group-এর Scientific Reports–এ প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম ছিল “Primary Productivity Connects Hilsa Fisheries in Bay of Bengal”।

গবেষণায় বলা হয়, সাধারণত সমুদ্রে ইলিশের স্বাদ ও ওজন তুলনামূলক কম থাকে, কারণ সাগরে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদকণা (ফাইটোপ্ল্যাংকটন) এবং প্রাণিকণা (জুপ্ল্যাংকটন) কম পরিমাণে থাকে। কিন্তু নদী ও মোহনায় এসব কণার উপস্থিতি বেশি। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় এদের ঘনত্ব সর্বোচ্চ। ফলে এই অঞ্চলের ইলিশের শরীরে উচ্চমাত্রার ওমেগা থ্রি ও ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি হয়, যা মাছের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকদের মতে, ইলিশ যখন সাগর থেকে স্রোতের উল্টো দিকে ঘণ্টায় প্রায় ৭১ কিলোমিটার গতিতে সাঁতরে নদীতে উঠে আসে, তখন তার শক্তি ও ওজন বাড়ে। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ধরা পড়া ইলিশ সবচেয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
অন্যদিকে, গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত ইলিশের মাত্র ২ শতাংশ আসে পদ্মা নদী থেকে, সেগুলোর আকারও তুলনামূলকভাবে ছোট।
গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, মেঘনা অববাহিকায় ইলিশের উৎপাদন রক্ষা করতে হলে জাটকা নিধন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নদী দূষণ হ্রাস এবং বেহুন্দি জাল নিষিদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে, তার আর্থিক মূল্য এখন প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা)। দেশের প্রায় পাঁচ লাখ জেলে ইলিশ আহরণে সরাসরি যুক্ত, আর এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ।
লক্ষ্মীপুরসহ মেঘনার উপকূলবর্তী অঞ্চলের এই ‘সোনালি মাছ’ শুধু বাংলাদেশের খাদ্যতালিকাতেই নয়, এখন গবেষণাভিত্তিক গর্বের প্রতীকও হয়ে উঠেছে।








