বুধবার, ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মায়ের বুকেই প্রথম পাঠশালা: মাতৃদুগ্ধেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

নামমাত্র একটি শব্দ—দুধ। কিন্তু মা যদি নিজেই তা দেন, তখন তা শুধু খাদ্য নয়, হয়ে ওঠে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, প্রতিরোধের প্রথম ঢাল, জীবনের প্রথম পাঠশালা। আমরা যারা মায়েদের কোল ছেড়ে অনেকদূরে এসেছি, তারা জানি, মাতৃদুগ্ধ মানে শুধু খাওয়ার বিষয় নয়—এ এক স্নেহের তরলরূপ।

আগামীকাল (১ আগস্ট) বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই এক ধরণের মায়ায় ভরে ওঠে মনটা। কল্পনায় ভেসে আসে এক মা, যিনি ঘুমন্ত শিশুর পাশে বসে আছেন, শিশুটি চোখ মেলেছে, একটু কান্না করছে, আর মা তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। সৃষ্টির এ এক অনুপম মুহূর্ত। একবার চিন্তা করুন, এমন এক বস্তু—যা সৃষ্টিকর্তা নিজে তৈরি করেছেন, যেটি শিশুদের জন্য তৈরি করা পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শ খাবার।

শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস তার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই সময়টাতে যদি শিশুকে শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো হয়, তাহলে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো হলে তার মৃত্যুঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখনো গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত অনেক পরিবার শিশুকে বুকের দুধের পরিবর্তে মধু, মিষ্টির পানি বা অন্যান্য খাবার খাওয়ায়। এসব প্রথা বহু পুরোনো, কিন্তু অনেক সময়ই ক্ষতিকর।

জন্মের পর যে দুধ প্রথম নিঃসরণ হয়, তার নাম কোলস্ট্রাম। এই সোনালি দুধটিকে অনেকেই ফেলে দেয়—অজ্ঞানতার কারণে। অথচ এই কোলস্ট্রামই হলো শিশুর প্রথম ভ্যাকসিন। এতে থাকে অ্যান্টিবডি, ল্যাকটোফেরিন, লিউকোসাইটসসহ এমন সব উপাদান যা শিশুর অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে, ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে, এবং পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃদুগ্ধপানে উৎসাহিত করা হলে শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হয় যেসব কারণে, তার অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য শুধু নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ালেই।

শুধু শিশু নয়, মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সন্তানকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান, তাদের স্তন ক্যান্সার ও ডিম্বাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কম। দেহের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় থাকে। এমনকি জন্ম পরবর্তী বিষণ্নতা (Postpartum Depression) থেকেও অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়। আর মানসিক দিক থেকে যে সংযোগটি তৈরি হয় মা ও সন্তানের মাঝে, তার তুলনা হয় না। যে শিশু মায়ের কোলের স্পর্শে বেড়ে ওঠে, সে হয় আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল এবং আবেগে ভারসাম্যপূর্ণ।

একটু অতীতে ফেরা যাক। আমাদের নানী বা দাদীরা যখন মা হতেন, তখন তাদের সন্তানদের বুকের দুধ ছাড়া কিছু খাওয়ানো হতো না। আধুনিকতা তখনও গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ঢোকেনি। ছিল না ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে লেখা দুধের ফর্মুলা, কিংবা বিজ্ঞাপনে ভরা শিশুখাদ্য। কিন্তু ছিল একটা অদ্ভুত বিশ্বাস—মায়ের দুধই সেরা। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সমাজের চিত্র। এখন অনেক মায়েরাই কর্মজীবী। তারা বাসা থেকে দূরে থাকেন, অফিসে সঠিক সময় পান না, কিংবা অনেক সময়ই সহানুভূতিশীল পরিবেশ পান না। ফলে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ সরকারি বা বেসরকারি অফিসে ‘ল্যাকটেশন কর্নার’ বা ‘ব্রেস্টফিডিং কর্নার’ থাকলে মায়েরা একটু নিরিবিলি জায়গায় বাচ্চাদের দুধ খাওয়াতে পারেন। এই ব্যবস্থাটা অনেক দেশেই আছে, আমাদের দেশেও ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে, তবে অগ্রগতি খুব ধীর।

 

বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (BBF) দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা বলছে, মাতৃদুগ্ধপান নিশ্চিত করতে হলে শুধু মায়ের নয়, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রাম বা শহর—সব জায়গাতেই জন্মের পর শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো দেশে অনেক মা গর্ভাবস্থার সময় ঠিকঠাক পুষ্টি পান না, যার প্রভাব পড়ে দুধ উৎপাদনে। আবার অনেকে দুধের ঘাটতির কথা বলে শিশুকে কৌটা দুধ খাওয়ান। অথচ শতকরা ৯৫ ভাগ মা-ই জন্মের পর সন্তানের প্রয়োজনীয় দুধ উৎপাদন করতে সক্ষম হন—যদি তারা মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাসী হন, এবং সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ পান।

“বুকের দুধ: স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের বীজ”– কথাটা শুধু শ্লোগান নয়, এর ভেতরে আছে ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথা। এক শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো মানে এক সুস্থ প্রজন্ম গঠনের দিকে হাত বাড়ানো। উন্নত জাতি গঠনের ভিত্তি শুরু হয় এখান থেকেই। একটা শিশু যদি প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খায়, এবং দুই বছর পর্যন্ত পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি বুকের দুধ পায়, তাহলে তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশ হয় সুস্থভাবে। সে বিদ্যালয়ে ভালো ফল করে, জীবনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এই সব মিলেই তৈরি হয় জাতির ভবিষ্যৎ।

 

মায়ের দুধ একটি প্রতীক– যা শুধু শরীর নয়, মনের খোরাকও জোগায়। মা হচ্ছেন এমন একজন যিনি নিজের শরীর ভেঙে সন্তানকে জীবন দেন। বুকের দুধ সেই ভাঙনের সবচেয়ে মহৎ নিদর্শন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু একমাত্র মায়ের দুধ–এটুকু যেন না ভুলি।

এই পৃথিবীর সব শিশু যেন পায় মায়ের বুকের নির্ভরতা, জীবনের প্রথম পাঠশালা–সেই কামনাই করি এবারের এই মাতৃদুগ্ধ দিবসে। কারণ একফোঁটা দুধেই লেখা থাকে জীবনের শুরু।

(লেখিকা: নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পথে প্রান্তরে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ