শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অবশেষে যে ৬২ বিষয়ে একমত হলো রাজনৈতিক দলগুলো

পথে প্রান্তরে ডিজিটাল ডেস্ক:

৬২ দফা প্রস্তাবে একমত দেশের রাজনৈতিক দলগুলো: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ২২তম দিনের সংলাপে ঐতিহাসিক অগ্রগতি

জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত কমিশনের ২২তম দিনের সংলাপে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারসহ মোট ৬২টি প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এই সংলাপে অংশ নেয়া বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও নারী প্রতিনিধিত্বে অগ্রগতি

৩০টি রাজনৈতিক দল সম্মত হয়েছে যে, বাংলাদেশে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে—যার একটি অংশ হবে জাতীয় সংসদ (নিম্নকক্ষ) এবং অন্যটি সিনেট (উচ্চকক্ষ)। দুই কক্ষেই বিরোধী দলের একজন করে ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, জাতীয় সংসদে নারী আসনের সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-এ উন্নীত করার বিষয়েও নীতিগতভাবে একমত হয়েছে ১৯টি দল।

ভাষা, পরিচিতি ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি

৩১টি দল একমত হয়েছে যে, সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’র পাশাপাশি দেশের সব নাগরিকের মাতৃভাষাগুলোকে প্রচলিত ভাষার মর্যাদা দিয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এছাড়া সংবিধানে বাংলাদেশের চরিত্রকে ‘বহুজাতি, বহুধর্মী, বহুভাষী ও বহু সংস্কৃতির’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে।

বিচার বিভাগে স্বাধীনতা ও কাঠামোগত সংস্কার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগে একটি স্বাধীন ‘বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার নেতৃত্ব দেবেন প্রধান বিচারপতি। আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ছাড়াও, বিচারকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন এবং প্রকাশ করার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি

নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংস্কার ও দায়িত্বজ্ঞান

জুলাই অভ্যুত্থান, ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাবে ৩২টি দল একমত হয়েছে। একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইন ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট সংশোধনের প্রস্তাবও এসেছে। কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে পৃথক প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে গঠনের এবং ভূমি আদালত স্থাপনের বিষয়ে একমত হয়েছে বিভিন্ন দল।

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে কঠোর পদক্ষেপ

দুদকের সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন, বৈধ উৎসবিহীন আয়ের বৈধতা বন্ধে আইন প্রণয়ন এবং নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য গঠিত হয়েছে। কমিশনারের সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচজনে উন্নীত করা এবং তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

এছাড়া, কমিশনার নিয়োগের জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব এসেছে, যারা নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। গুরুত্বপূর্ণভাবে, দুদক আইন, ২০০৪-এর ৩২(ক) ধারা বিলুপ্ত করে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদনের বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের (OGP) সদস্যপদ গ্রহণের দিকেও অগ্রসর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংলাপে গৃহীত এসব প্রস্তাব পরবর্তী ধাপে আইন ও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কমিশন সূত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর এই ঐকমত্য ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বাঁকবদলের ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ