নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
একটা মা তাঁর মৃত সন্তানের নিথর শরীর বুকে জড়িয়ে বসে আছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর। তার চোখে কান্না নেই। কারণ চোখের পানি শুকিয়ে গেছে বহু আগেই। পাশে রক্তাক্ত মাটি, গুঁড়িয়ে যাওয়া ঘর আর কিছু মানুষ—যাদেরকে আর মানুষ বলা চলে না, তারা এখন জীবন্ত লাশ। না, এটা কোনো উপন্যাস নয়, এটা বাস্তব। জায়গাটার নাম ‘গাজা’।
গাজায় অবস্থা এখন এমন যে সেখানে খাবার খুঁজতে বের হওয়া মানেই মৃত্যু নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুইদিনে একশোরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে গাজায়—তাদের অপরাধ কী ছিল? তারা খাবার চেয়েছিল। হ্যাঁ, শুধুমাত্র খাবার। একমুঠো ভাত, আধটা রুটি কিংবা সামান্য চাল-ডাল, এইটুকুর আশায় তারা রাস্তায় নেমেছিল। আর ফিরেছে কফিনে।

একটা রুটি গিলে জীবন বাঁচে, একটা গুলি খেয়ে জীবন ফুরায়। কিন্তু গাজার শিশুগুলোর এখন এই পার্থক্য বোঝার সময় নেই। তাদের ছোট হাত খাবার খোঁজে, আর ইসরাইলি বুলেট খুঁজে নেয় সেই হাত। জাতিসংঘের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক জানান, ত্রাণ নিতে যাওয়া পথে কিংবা সেনাদের তৈরি তথাকথিত বিতরণ কেন্দ্রগুলোর কাছে শত শত মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। আর ত্রাণকর্মীরা তো নিজেদের জীবন হাতে করে পথে নামছেন।
একটা জাতির এইভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া, বেঁচে থাকার সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া—মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটি অন্যতম কলঙ্ক। ফারহান হক ঠিকই বলেছিলেন, “খাবার খোঁজার জন্য কখনো কাউকে জীবনের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করা উচিত নয়।” কিন্তু এই কথাগুলো এখন কাগজে লেখা থাকে, আর গাজার শিশুরা কবরের মাটিতে ঘুমায়।
একজন মায়ের কোলে সন্তানের মৃতদেহ—এই দৃশ্যটা যতবার দেখি, ততবার হৃদয়ের ভেতর কেমন একটা হাহাকার ওঠে। অথচ গাজায় এই দৃশ্য এখন নিত্যদিনের চিত্র। একটা ছোট মেয়ে, তার বয়স হয়তো ছয়-সাত। সে তার ছোট ভাইয়ের হাত ধরে দৌড়াচ্ছিল ত্রাণ নেওয়ার আশায়। হঠাৎ পেছনে একটা বিস্ফোরণ—ভাইটা পড়ে যায়। মেয়েটা থেমে যায়, কান্না থেমে যায়, সময় থেমে যায়। কারণ ও জানে, ও আর ফিরে পাবে না তার ভাইকে।

ইসরাইল বলছে তারা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ চালাচ্ছে। কিন্তু সেই অভিযানে এখনো পর্যন্ত কেন নিহত হয়েছে ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি, যাদের বেশিরভাগই নারী আর শিশু? আপনি কি জানেন, প্রতি ১০ মিনিটে একজন শিশু মারা যাচ্ছে গাজায়? এই পরিসংখ্যান কোনো কল্পনা নয়, এইটা জাতিসংঘের হিসাব। যুদ্ধের নিয়ম বলে, বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। কিন্তু গাজায় সে নিয়ম এখন কবর দেওয়া হয়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে।
মানবতা শব্দটা এখন শুধু অভিধানে আছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা চিৎকার করে বলছেন, “ত্রাণ পৌঁছাতে দাও, মানুষ বাঁচাতে দাও!” কিন্তু ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সেই পথগুলোকেই বিপজ্জনক করে রেখেছে। একবার কল্পনা করুন, আপনি একজন ত্রাণকর্মী। আপনি রুটি নিয়ে যাচ্ছেন এক দল অনাহারী শিশুর কাছে। কিন্তু জানেন না, রুটির প্যাকেটটা পৌঁছাবে আগে, নাকি আপনি মরবেন আগে। এই ভয় নিয়ে কেউ কাজ করে না, শুধু গাজার মানুষ করে।
আমরা প্রতিদিন খাবার অপচয় করি, রেস্টুরেন্টে বিল দিয়ে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করি। অথচ সেই মুহূর্তে গাজার একজন মা তার সন্তানকে পানি ফুটিয়ে খাওয়াতে চাইছে—কারণ চাল নেই, ডাল নেই। এই পৃথিবীটা এতো বৈষম্যমূলক কেন? খাবার কি শুধু ধনীদের জন্য? স্বাধীনতা কি শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য?
গাজার শিশুরা যখন রাতের আকাশে বোমার শব্দে ঘুম ভাঙে, তখন তারা ভাবে, ‘এইবার বুঝি আমাদের পালা’। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা কেন মৃত্যুর ভয়ে ঘুমায়? পৃথিবী এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে?

একটা সময় ছিল, যখন শিশুদের জন্য আমরা গল্প বলতাম ঘুম পাড়ানোর। এখন সেই শিশুদের মৃত্যু যেন আমাদের গল্প হয়ে গেছে।
এই লেখা সেই গাজার শিশুদের জন্য, যারা খাবার খুঁজতে গিয়ে জীবনের পাট চুকিয়ে ফেলেছে। যারা স্কুলব্যাগের বদলে এখন কবরের চাদর গায়ে দেয়। যারা দৌড়াতে গিয়ে ফিরে আসেনি, শুধু নিথর শরীর হয়ে শুয়ে আছে কোথাও।
বিশ্ব যদি এখনো না জাগে, যদি এখনো চোখ না খোলে, তাহলে ভবিষ্যতে ইতিহাস একটিই কথা বলবে—মানবতা তখন মরে গিয়েছিল গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে। আর আমরা সবাই ছিলাম সেই মৃত্যুর নীরব সাক্ষী।
গাজার মানুষ বাঁচার জন্য যুদ্ধ করছে না, তারা খাবার চায়।
আর আমরা কী করছি?
শুধু তাকিয়ে থাকছি। নিরব দর্শক হয়ে।








