পথে প্রান্তরে ডিজিটাল ডেস্ক:
জুলাই মাসে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
রোববার সকালে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন সদস্যের বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে সূচনা বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। এ বিচার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মোট পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। মামলাটি ‘চিফ প্রসিকিউটর বনাম শেখ হাসিনা গং’ নামে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর আগে ১ জুন প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তদন্ত সংস্থা গত ১২ মে মামলার প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে শেখ হাসিনাকে জুলাই-অগাস্টের সহিংসতার ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ-১:
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকার’ ও ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উল্লেখ করেন এবং তাদের নির্মূলের আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সহিংস হামলায় প্রায় ১,৪০০ ছাত্র-জনতা নিহত ও প্রায় ২৫,০০০ আহত হন। অনেকে স্থায়ী অঙ্গহানি ও দৃষ্টিশক্তি হারান। এ ঘটনায় উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ প্রদানের অভিযোগে প্রথম অভিযোগটি গঠন করা হয়।
অভিযোগ-২:
১৪ জুলাই গণভবন থেকে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে এবং ১৮ জুলাই ভাতিজা শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ফোনালাপে শেখ হাসিনা স্বীকার করেন, তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনার আলোকে পুলিশ, র্যাব, ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ বিভিন্ন বাহিনী সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে। এই ঘটনায় ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’-র আওতায় দ্বিতীয় অভিযোগ গঠন করা হয়।
অভিযোগ-৩:
১৬ জুলাই রংপুরে নিরস্ত্র আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হত্যার পর লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয় এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন করতে চারবার পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন পরিবর্তন করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে ‘সুপিরিয়র কমান্ড’ হিসেবে আসামিদের দায়ী করে তৃতীয় অভিযোগ গঠন করা হয়।
অভিযোগ-৪:
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আহ্বান জানানো হলে, ঢাকার চানখারপুল এলাকায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে শহীদ শহরিয়ার খান আনাজ, জুনাইদসহ আরও চারজন ছিলেন। এই ঘটনাটি ঘটানো হয় অভিযুক্তদের নির্দেশে, যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর আওতায় চতুর্থ অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগ-৫:
৫ আগস্ট বিকেলে সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের একটি দল সাবমেশিনগান ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তাদের একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। একজন ভুক্তভোগী তখনও জীবিত ছিলেন, কিন্তু তাকেও বাঁচানোর চেষ্টা না করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দায়ে পঞ্চম অভিযোগ গঠন করা হয়।








