তৌহিদ সাকিব, পথে প্রান্তরে:
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার দীর্ঘায়িত শাসনামল ছিলো এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রচ্ছদে ঢাকা হলেও এই শাসনামলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ, বিরোধী দল ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ, গণমাধ্যম দমন, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা সীমিতকরণসহ একধরনের ‘নীরব ফ্যাসিজম’ বিকাশ লাভ করে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া গণজাগরণের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বিরাট জনদল সংগঠিত হয়, যা পরিণত হয় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগের ঘটনায়। এই লেখায় সেই প্রেক্ষাপট, ঘটনার কারণ-পরিণতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আলোচনা করা হবে।
শেখ হাসিনার শাসনামল ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার একটি স্থিতিশীলতার ধারণা তৈরি করলেও, বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমনমূলক নীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা ক্রমশ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকায় একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে আরও দৃঢ় হয়। তবে, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রতিবাদ বৃদ্ধি পায়, কারণ বিরোধী দলগুলোর দাবি ছিল নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়নি।
শেখ হাসিনার শাসনামলে শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী কণ্ঠরোধের নানারকম কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে—গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার, সাংবাদিক দমন ও ভয়-ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার দ্বারা তথ্যপ্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, যা বিরোধী মত প্রকাশের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য বাঁধা সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন এই রাজনৈতিক অবস্থারই একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া। কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে ছাত্ররা শুরু করলেও দ্রুত এটি রূপ নেয় বিরোধী দল ও সকল পেশার সাধারণ জনসাধারণের বৃহৎ আন্দোলনে। আন্দোলনটি ছিল মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গণজাগরণের সূচনা করে।
সরকারি বাহিনী এবং আওয়ামিলীগের ছাত্র সংগঠনগুলো সেই আন্দোলন দমন করতে গুলি চালানোসহ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার ফলে নিহত এবং আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এই দমন-পীড়ন জনমনে আরও ক্ষোভ বাড়ায় এবং আন্দোলনের ভর দ্বিগুণে বৃদ্ধি পায়। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের এই কড়া মনোভাবই আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে এবং তা পরবর্তীতে সরকার পতন আন্দোলনে রুপ নেয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশাল জনসমাবেশ ও বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা সরকার ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা প্রধান ও রাষ্ট্রপতি একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি দেশের রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
তবে, এই উত্তাল পরিবর্তনের মধ্যেও ছিলো নানা অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারকে মেনে নিতে না চাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যা দেশের নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলার জন্য বিপদের আশংকা সৃষ্টি করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দূরদর্শিতা আর বিচক্ষণতায় সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হয়।
শেখ হাসিনার শাসনামল যে আধুনিক ফ্যাসিজমের দিকেই এগিয়েছিল, তা তার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা, বিচার ব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একপক্ষীয় শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা, বিরোধীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আইনের অপব্যবহার তার সেই ফ্যাসিজম শাসনের বিশেষ ট্রেডমার্ক ছিল।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি প্রমাণ করল যে, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও দমন-শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন ক্ষমতাসীনরা টিকে থাকতে পারে না।
এখন, দেশের সামনে রয়েছে সাংবিধানিক সংস্কার, স্বাধীন নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মতো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন ও গঠনমূলক সংলাপ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রয়োজনীয় সেই সকল সংস্কারের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার শাসনামল ছিলো একটি আধুনিক একনায়কতন্ত্রের উদাহরণ যেখানে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর ব্যাপক দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের ঘটনা সেই শাসনব্যবস্থার পতনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে জনগণের অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সুষ্ঠু শাসনের প্রত্যাশা বিরাট।
অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এখন বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্য। সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন এবং দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়া দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। জাতীয় ঐক্য, গঠণমূলক মতবৈচিত্র্যের স্বীকৃতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হবে- এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।








