রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তীব্র হচ্ছে বাণিজ্যযুদ্ধ: আজ থেকেই কার্যকর ট্রাম্পের নতুন শুল্কহার

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা আরও এক ধাপ বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তা আজ বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) থেকেই কার্যকর হয়েছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেতৃত্বে চলা বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।

ট্রাম্প মধ্যরাতে তার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে লিখেছেন, “এখন মধ্যরাত! বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আমেরিকায় ঢুকছে!”—যা নতুন শুল্কনীতির শুরু ঘোষণা করে।

বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক কমেছে

সর্বশেষ আলোচনার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে।

ভারতের ওপর দ্বিগুণ শুল্ক

বুধবার (৬ আগস্ট) ট্রাম্প ভারতের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে মোট ৫০ শতাংশে উন্নীত করেন। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা বন্ধ করতে ভারতকে চাপ দেওয়ার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে নয়াদিল্লি একে “অন্যায়, অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন” সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছে। ভারতের ওপর এই শুল্ক ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রযুক্তি খাতে শুল্কের হুমকি

ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমেরিকায় বিনিয়োগ না করে, তাহলে বিদেশে তৈরি কম্পিউটার চিপের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এরই মধ্যে অ্যাপল ঘোষণা দিয়েছে, তারা আমেরিকায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন

ট্রাম্প প্রশাসন আমদানি পণ্যের তালিকা হালনাগাদ করে এবং দেশগুলোকে চুক্তি করার জন্য ৭ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছিল। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে যাতে শুল্ক কমানো বা শুল্কের আওতা থেকে বাদ পড়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব দেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সেসব দেশকে লক্ষ্য করেই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ যেমন লাওস ও মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা তাদের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি সঙ্গীরা

তবে যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো আগেভাগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে শুল্ক কমিয়ে নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে তারা ১৫ শতাংশ শুল্কে সম্মত হয়েছে।

তাইওয়ানের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট এটিকে “অস্থায়ী” উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

কানাডা ও মেক্সিকো

কানাডার ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, কানাডা মাদক পাচার ঠেকাতে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না। তবে কানাডার বেশিরভাগ পণ্য পূর্ববর্তী এক চুক্তির আওতায় থাকায় এসব শুল্ক থেকে রেহাই পাবে।

মেক্সিকোর ওপর নতুন শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে এবং আলোচনা চলমান রয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর ও দক্ষিণ আমেরিকা

বুধবার ট্রাম্প বলেন, বিদেশে তৈরি সেমিকন্ডাক্টরের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে যেসব কোম্পানি আমেরিকায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে—যেমন: টিএসএমসি, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স—তাদের এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

ব্রাজিলের ওপরও ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণ করছেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর বিরুদ্ধে মামলা চালানোকে “উইচ হান্ট” বলে অভিহিত করেছেন।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায়

এই প্রেক্ষাপটে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে যাতে ১২ আগস্ট শেষ হতে যাওয়া ৯০ দিনের শুল্ক বিরতির সময়সীমা বাড়ানো যায়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি বিশ্ববাণিজ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ