,

‘চিরকুট লিখে না গেলে পুলিশ কাকে না কাকে ফাঁসিয়ে টাকা খাবে’

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রাম। চারপাশে সোনালি রঙের ধানক্ষেত, গাছের ডালে ভোরের আলো ঝুলে আছে শিশিরের মতো। কিন্তু এই সকাল আজ অন্য রকম। এই সকাল রঙ হারিয়েছে চারটি লাশের ছায়ায়।

শুক্রবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে মিনারুল (৩৫), তার স্ত্রী মনিরা (২৮), স্কুলপড়ুয়া ছেলে মাহিম (১৩) এবং দেড় বছরের কন্যা মিথিলার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দৃশ্যটি এমন—এক ঘরে বিছানায় মা ও মেয়ে, পাশের ঘরে বিছানায় ছেলে, আর সেই একই ঘরের ফ্যানে ঝুলছে মিনারুলের দেহ। ঘরের নীরবতা এত গভীর যে মনে হবে—এখানে মৃত্যু এসে বসে আছে, কারও গলা টিপে ধরে চুপ করে গেছে।

মৃত্যুর আগে মিনারুল লিখে গেছেন দুটি চিরকুট। হাতের লেখা স্বজনেরা চিনেছেন। যেন মৃত্যুর সঙ্গেই লিখিত এক চুক্তি—

“আমি মিনারুল নিচের যেসব লেখা লিখব, সব আমার নিজের কথা। লিখে যাচ্ছি এই কারণে আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাব। এই মরার জন্য কারো কোনো দোষ নেই। কারণ, লিখে না গেলে বাংলার পুলিশ কাকে না কাকে ফাঁসিয়ে টাকা খাবে। আমি মিনারুল প্রথমে আমার বউকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিনকে মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছি।”

অন্য চিরকুটে আরও গভীর বেদনার স্বীকারোক্তি—

“আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম। এই কারণে যে, আমি একা যদি মরে যাই, তাহলে আমার বউ, ছেলে, মেয়ে কার আশায় বেঁচে থাকবে? কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম, সেই ভালো হলো।”

বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রাতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে ধারণা পুলিশের। রাত ১১টার দিকে মিনারুল বাড়ি ফেরেন। তার স্ত্রী ও মেয়ে এক ঘরে, ছেলে অন্য ঘরে ঘুমাচ্ছিল। বড় ভাই, ভাবি ও ভাতিজি আলাদা ঘরে ছিলেন। উঠোনে ঘুমাচ্ছিলেন বাবা-মা। কেউ কিছু টের পাননি।

সকাল ৮টার দিকে ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী ঘরের টিনের ওপর উঠে তাকিয়ে দেখেন ছেলের ঝুলন্ত দেহ। দরজা কেটে ভেতরে ঢুকতেই মেলে স্ত্রীর, সন্তানের মরদেহ। মুহূর্তেই পুরো বাড়ি, উঠোন, গ্রাম ডুবে যায় হাহাকারে।

চাচি জানেহার বেগম বললেন,
“মিনারুলের কয়েকটা কিস্তি ছিল। কিস্তির জন্য বাড়িতে থাকত না। মাঝে মাঝে কিস্তির লোক এসে আমরা বলতাম, মিনারুল বাড়িতে নাই। কখনও কৃষিকাজ, কখনও ট্রাকের হেলপার, আবার কখনও মাছের জাল টানা—যা পেত করত। রাগ ছিল বেশি, কেউ কটু কথা বললে কাজে যেত না। অভাব লেগেই থাকত।”

স্থানীয় চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ জানালেন,
“দুইদিন আগে মিনারুল এসেছিল। বলল, ঘরে চাল নেই। আমি দুই হাজার টাকা দিয়েছিলাম চাল কেনার জন্য। বছর তিনেক আগে তার বাবার পাঁচ কাঠা জমি বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ শোধ করানো হয়েছিল। কিন্তু আবার কিস্তি নেয়। এলাকার লোকজন জানে, সে জুয়া খেলত। সেই আসক্তিই তাকে বারবার দেনায় ফেলেছে।”

শোকাহত উঠোনে তখন মিনারুলের মা আনজুরা বেগম বারবার ছেলের নাম ধরে কাঁদছিলেন—
“ও জান! এই কইরি গেলি ক্যানরে বাপ… আমি মাটি বেইচি আবার দিতুক রে জান। বাপের এক কাঠা পাইছি, ওডি বেইচি আবার দিতুক রে বাপ। আমার তো কিছুই থাইকল না।”

ঘটনার পর রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন,
“স্ত্রী ও মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। ছেলেকেও শ্বাসরোধ করা হয়েছে। মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করছি। ময়নাতদন্ত শেষে সঠিক কারণ জানা যাবে।”

এই গ্রামের সকাল আজ আর ধানক্ষেতের সুবাসে ভরপুর নয়—এখানে এখন শুধুই কাঁদতে থাকা মানুষের গলায় শুকনো শব্দ, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই শেষ চিরকুটের হাহাকার—
“লিখে না গেলে বাংলার পুলিশ কাকে না কাকে ফাঁসিয়ে টাকা খাবে…”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ