শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জহির রায়হান: জীবন থেকে নেয়া এক জীবন

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:

১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে এক ছোট ছেলে জন্ম নিল। নাম রাখা হলো জহির। গ্রামটায় সবকিছু ছিল শান্ত—মাঠ, পুকুর, পাঁড়, গাছপালা। আর সেই ছেলের চোখে সবকিছু যেন নতুন নতুন গল্প বলত। ছোটবেলাতেই সে বুঝতে পারত, বইয়ের শব্দগুলো কত বড় জাদু খেলে। মাটি ছুঁয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার কল্পনা গাছের মতো বেড়ে উঠত। বাবা-মায়ের কাছে সে ছিল এক সাধারণ ছেলে, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে ছিল সেই মানুষটি, যাকে আমরা পরে জহির রায়হান নামেই চিনব।

দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসে পরিবার। নতুন শহর, নতুন মানুষ—সবই যেন তার কল্পনার রং চড়িয়ে দিল। ঢাকার কলেজ জীবন তাকে সাহিত্যের গভীরে ডুব দিতে শেখালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করা, আর সেই সঙ্গে সাংবাদিকতার শুরু—‘যুগের আলো’, ‘প্রবাহ’, ‘সিনেমা’—প্রত্যেক পত্রিকার পাতা যেন তার হাতের কাছে গল্পের ফানুস।

তবে লেখা, চলচ্চিত্র—সব মিলিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রমণ শুরু হয় ১৯৬০ সালে। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ, তারপর জন্ম নিল ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কাঁচের দেয়াল’। এই উপন্যাসগুলো কেবল গল্প নয়, মানুষের ভেতরের ফাঁকফোকর, সমাজের আভ্যন্তরীণ দুঃখ-দুর্দশা—সবই ধরা পড়ে জহিরের কলমে। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

চলচ্চিত্রও তার জীবনের আরেক রঙ। ১৯৫৭ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে প্রথমবার নিজস্ব দিকনির্দেশনা। ১৯৬৪ সালের ‘সঙ্গম’ পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। ‘কাঁচের দেয়াল’ আর ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’—প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র যেন তার হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কলকাতায় ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—জহির সবসময় সামনের সারিতে। নিজের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থও তিনি দান করেন মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে। মানুষদের জন্য যে অগ্নি লাগে, সে তার ভেতর থেকেও জ্বলছে।

কিন্তু জীবন সবসময় গল্পের মতো সহজ নয়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে মিরপুর ১২ নম্বরে, সেনা ও পুলিশের সঙ্গে গিয়ে, এক অজানা হামলায় তার জীবন থেমে যায়। তার মৃত্যুতে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের জগৎ শোকাহত হয়। কিন্তু তার সৃষ্টি, তার সাহস, তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও বেঁচে আছে।

তার স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী সুমিতা দেবী। সংসার, সাহিত্য, চলচ্চিত্র—সব মিলিয়েই তার জীবন ছিল পূর্ণতার এক রূপকথা, যদিও খুব অল্প সময়েই সেই রূপকথা শেষ হয়ে যায়। আর জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিহত হন।

জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে অমর হয়ে আছেন। আমরা তাকে হারিয়েছি, কিন্তু ১৯ আগস্টে তার জন্মদিনে আমরা তাকে স্মরণ করি। মনে করি সেই ছোট ছেলেটিকে, যার চোখে সবসময় গল্প আর মানুষের জীবন ছিল। তার রচনা ও চলচ্চিত্র আজও আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন করে মুগ্ধ করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ