শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হারিয়ে যাওয়া ঢাকার পুরনো সিনেমা হলের গল্প

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার একসময়কার সকাল শুরু হতো দেয়ালজুড়ে টাঙানো নতুন সিনেমার রঙিন পোস্টার দিয়ে। চকচকে কাগজে নায়ক-নায়িকার বড় বড় ছবি, নীচে লাল-হলুদ অক্ষরে লেখা—“আজ মুক্তি পাচ্ছে”, “আসিতেছে..”—এইসব শব্দগুচ্ছ যেন পুরো শহরকে উত্তেজনায় ভরিয়ে দিত। দুপুর গড়াতেই টিকিট কাউন্টারের সামনে জমে যেত ভিড়। কেউ অফিস শেষে বন্ধুদের নিয়ে, কেউ আবার পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যেত। যেন প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া ছিল একপ্রকার সামাজিক উৎসব—ঢাকাবাসীর জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজাদ, মুক্তি, বলাকা, গ্লোব, গুলিস্তান, শ্যামলী—কত নাম যে ছিল! প্রত্যেকটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা, প্রথম ডেট কিংবা বন্ধুবান্ধবের হইচই। পুরনো ঢাকার সরু গলিতে হেঁটে সিনেমা হলে ঢোকার সেই অনুভূতি আজ আর পাওয়া যায় না। অন্ধকার হলে বসে যখন হঠাৎ পর্দা আলোকিত হয়ে উঠত, তখন দর্শকদের চোখে মুখে যে বিস্ময় আর আনন্দের ঝলক দেখা যেত, সেটা ছিল একেবারেই আলাদা।

সত্তর-আশির দশকে ঢাকার সিনেমা হলগুলো ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র। কোনো জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার ছবি মুক্তি পেলে টিকিটের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত মানুষ। টিকিট ব্ল্যাকেও বিক্রি হতো, আর অনেকেই বেশি দাম দিয়েও সেটা কিনতে দ্বিধা করত না।

“বেদের মেয়ে জোসনা” সিনেমাটি মুক্তির সময় এত ভিড় হয়েছিল যে মানুষ লাইন ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছিল। ঢাকার রিকশাচালক থেকে শুরু করে নামকরা ব্যবসায়ী—সবার আলোচনার কেন্দ্র ছিল সিনেমাটি।

গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে তখনকার এক দৃশ্য অনেকেই আজও মনে করেন। রাত দশটার শো শেষ হয়েছে, কিন্তু বাইরে তখনও কয়েকশো মানুষ দাঁড়িয়ে, শুধু পর্দা থেকে আসা আলোটা যেন আরেকটু দেখা যায় কিনা! এরকম উন্মাদনা একসময় ঢাকার প্রতিটি গলিতে দেখা যেত। গ্লোব সিনেমা হলে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির নাম শুনলেই আশপাশের ছাত্ররা ক্লাস ফাঁকি দিত, আবার শ্যামলী সিনেমা হলে শুক্রবারের টিকিট পেতে ভোরে লাইন ধরত সিনেমাপ্রেমী পরিবারগুলো। আর পুরান ঢাকার আজাদ সিনেমা হল—যেটা একসময় রাজনৈতিক মিছিলের শুরু কিংবা শেষ হওয়ার জায়গা হিসেবেও ব্যবহার হতো—সে জায়গা হয়ে উঠেছিল অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের প্রেক্ষাগৃহ।

তবে সিনেমা হলে যাওয়া শুধু সিনেমা দেখার জন্যই ছিল না, ছিল সামাজিক আড্ডার এক অন্যরকম আবহ। পরিবার নিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখা, তারপর কাছের হোটেলে খাওয়া দাওয়া—এসব ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের আনন্দঘন স্মৃতি। যারা প্রেমে পড়ত, তাদের জন্য সিনেমা হল ছিল প্রথম হাত ধরা, প্রথম গোপন চোখাচোখির জায়গা। তখনকার সমাজে প্রেম প্রকাশের জায়গা খুব একটা ছিল না, তাই অন্ধকার হলে বসে চোখের ভাষায় কথা বলাই হয়ে উঠত প্রেমের প্রথম পাঠ।

ঢাকার কেন্দ্রীয় জায়গাগুলোতে সিনেমা হল মানেই ছিল জমজমাট এক মিলনকেন্দ্র। নিউমার্কেটের গ্লোব সিনেমা হল থেকে বের হয়ে অনেকে বই কিনত আজিজ মার্কেটে, কেউ যেত আইসক্রিম খেতে “ফ্যালকন”-এ, আবার কেউবা চলে যেত ধানমন্ডির লেকে। সিনেমা হল তাই শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং শহরের সামাজিক মানচিত্রের সঙ্গে মিশে থাকা এক অভিজ্ঞতা ছিল।

কিন্তু সেই সোনালি দিন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসতে লাগল। প্রথমে ভিসিআর আর ভিডিও ক্যাসেট বাজার দখল করল, মানুষ ঘরে বসেই সিনেমা দেখতে শুরু করল। তারপর ক্যাবল টিভি এল, হাতে এল অসংখ্য বিদেশি চ্যানেল। হলে গিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার ধৈর্য মানুষের আর থাকল না। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আমাদের চলচ্চিত্রের মানহীনতা, অশ্লীল ছবির আগ্রাসন। পরিবার নিয়ে হলে যাওয়ার সেই নিরাপদ পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেল। একে একে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল সিনেমা হলগুলো। কোথাও তৈরি হলো শপিং মল, কোথাও অফিস ভবন। গুলিস্তান, গ্লোব, আজাদ—সবই যেন একে একে হারিয়ে গেল।

এমনকি বলাকা সিনেমা হল, যেটা একসময় নতুন ছবির মুক্তির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে দর্শক হারাতে শুরু করল। বলাকার ভেতরের ঝাড়বাতি, সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে টিকিট কালোবাজারির হাঁকডাক—এসব আজ কেবল স্মৃতি। মুক্তি সিনেমা হল একসময় ছিল তারুণ্যের প্রাণকেন্দ্র, কিন্তু সেটা এখন যেন নামমাত্র। পুরনো ছবির পোস্টার, খসে পড়া রঙ—সবই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তবু যাঁরা সেই সময়টায় ছিলেন, তাঁদের মনে আজও গেঁথে আছে সেই অভিজ্ঞতা। কারো মনে আছে শৈশবের প্রথম সিনেমা হলে যাওয়া, পর্দায় আলোর ঝলক দেখে চমকে ওঠা। কারো মনে আছে বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ পালিয়ে গিয়ে দুপুরে সিনেমা দেখা। আবার কেউ মনে রেখেছেন সেই সাদাকালো ছবির গান, যেগুলো হলে গুনগুন করে গাইত দর্শক। ঢাকার বাতাসে যেন তখন এক অদ্ভুত উৎসবের গন্ধ মিশে থাকত।

আজকের প্রজন্ম হয়তো মাল্টিপ্লেক্সে যায়, কিংবা ঘরে বসে ওটিটিতে সিনেমা দেখে। আসন আরামদায়ক, পরিবেশ আধুনিক, টেকনোলজি নিখুঁত। কিন্তু সত্তর বা আশির দশকের সেই মায়া, সেই সরল উচ্ছ্বাস কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তখনকার হলে বসে কেউ কেউ কান্না থামাতে পারেনি, আবার কেউ হাততালি দিয়ে উল্লাস করেছে—অচেনা দর্শকরাও একে অপরের সঙ্গে হাসি ভাগাভাগি করেছে। এই সম্মিলিত আবেগটাই ছিল সিনেমা হলের প্রকৃত শক্তি, যা আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঢাকার পুরনো সিনেমা হলগুলো তাই কেবল ইট-কাঠ-পাথরের প্রেক্ষাগৃহ ছিল না, ছিল মানুষের আবেগের আস্তানা। সেখানে জন্ম নিয়েছিল বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, কখনো বা জীবনের প্রথম স্বপ্ন। আজ তাদের অধিকাংশই বিলুপ্ত, জায়গা করে দিয়েছে কোলাহলময় শপিং মলের কাছে। কিন্তু পুরনো ঢাকার গলি ধরে হাঁটলে, অনেকের চোখের সামনে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই পোস্টার, সেই ভিড়, সেই অন্ধকার হলের উজ্জ্বল পর্দা। আর তখনই মনে হয়—ঢাকার হারানো সিনেমা হলগুলো আসলে হারায়নি, তারা বেঁচে আছে আমাদের স্মৃতির গভীরে, জীবনের মধুরতম সময়ের নিদর্শন হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ