আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:
১৯১১ সালের ২১ আগস্ট। প্যারিসের আকাশে ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি নামেনি। লুভ মিউজিয়ামের বিশাল ভবন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। প্রতিদিনের মতোই সেদিনও কর্মীরা কাজ শুরু করেছিলেন, কেউ গ্যালারির ঝাড়পোছ করছেন, কেউ শিল্পকর্মের তদারকি করছেন। কিন্তু সেই দিনটা হয়ে উঠল এমন এক সকাল, যেটা ইতিহাসে চিরদিনের মতো থেকে যাবে। কারণ সেদিন লুভের দেয়াল থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অমূল্য চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’।
মাত্র ত্রিশ বাই বিশ ইঞ্চির ছোট্ট ছবিটি, অথচ তার মাহাত্ম্য সীমাহীন। সেই রহস্যময় হাসি—যা দেখে কেউ ভাবেন কৌতুক, কেউ খুঁজে পান দুঃখের ছাপ, আবার কারও মনে হয় অমর প্রেমের ইঙ্গিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পানুরাগীরা বিস্মিত থেকেছেন তার চোখের দৃষ্টিতে, ঠোঁটের কোণের গোপন কথায়। কিন্তু ২১ আগস্টের সেই সকালে ছবিটি হঠাৎ যেন উধাও হয়ে গেল।
প্রথমে কেউ বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছিল না। অনেকে ভেবেছিলেন হয়তো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে নামানো হয়েছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে—মোনালিসা চুরি হয়েছে! মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে প্যারিসের রাস্তায়। পত্রিকার শিরোনামে বড় বড় অক্ষরে লেখা হলো, “মোনালিসা উধাও!” সাধারণ মানুষ হতবাক, শিল্পপ্রেমীরা বিমর্ষ। লুভ মিউজিয়ামের সামনে ভিড় জমল হাজার মানুষের। কেউ হতাশায় মাথা নাড়লেন, কেউ অশ্রু ফেললেন।
এই নাটকীয় চুরির পেছনের চরিত্র ছিলেন ভিনচেনজো পেরুজ্জা। ইতালির এই তরুণ আগে মিউজিয়ামে কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তার ভেতরে এক ধরনের জাতীয়তাবোধ কাজ করত। মনে করতেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির সৃষ্টি ইতালির মাটিতেই থাকার কথা। সেই আবেগ থেকেই তিনি পরিকল্পনা করেন এক অসম্ভব কাজের—লুভের দেয়াল থেকে মোনালিসা চুরি করা। রবিবার রাতে তিনি মিউজিয়ামের ভেতরে লুকিয়ে থাকেন। পরদিন সকালে কর্মীদের পোশাক পরে সবার মতো কাজ শুরু করার ভান করেন। ধীরে ধীরে ছবির কাচ খুলে ফেলেন, ফ্রেম থেকে আলাদা করেন এবং কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান। কোনো গোলযোগ নয়, কোনো হৈচৈ নয়, অবিশ্বাস্যভাবে নিঃশব্দ এক নাটকীয় চুরি।
পরের দুই বছর ছবির আর কোনো খোঁজ মেলেনি। তদন্ত চলল, সন্দেহভাজন হিসেবে শিল্পী পিকাসোকেও একসময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু সব ব্যর্থ। মোনালিসার অনুপস্থিতি যেন আরও রহস্যময় করে তুলল তাকে। প্যারিস শহর যেন হাহাকার করে উঠল—চিত্রকর্মটি কোথায়? সে কি আর কোনোদিন ফিরে আসবে?
অবশেষে ১৯১৩ সালে নাটকীয়ভাবে ধরা পড়লেন পেরুজ্জা। ফ্লোরেন্সের এক শিল্প ব্যবসায়ীর কাছে ছবিটি বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি। পুলিশ ছবিটি উদ্ধার করে। দুই বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে ফিরে এলো মোনালিসা, ফিরে এলো লুভ মিউজিয়ামে। যখন ছবিটি পুনরায় প্রদর্শিত হলো, তখন মানুষের আনন্দ ও আবেগের সীমা রইল না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চুরিই মোনালিসাকে বিশ্বব্যাপী আরও বেশি পরিচিত করে তোলে। চুরির আগে তিনি ছিলেন রেনেসাঁস শিল্পের শ্রেষ্ঠ উদাহরণগুলোর একটি; কিন্তু ফেরার পর তিনি হয়ে গেলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম। লুভ মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝুলে থাকা এই ছোট্ট ছবির সামনে তখন থেকে শুরু হয় অসীম মানুষের সারি। কেউ কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখতে পান, কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন—শুধু এক ঝলক রহস্যময় হাসি দেখার জন্য।
মোনালিসার চুরির পর লুভ মিউজিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমূল বদলে যায়। আজ তিনি বুলেটপ্রুফ কাচের ভেতরে রাখা। তবু ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে যখন কেউ ছবির দিকে তাকান, তখনও মনে হয়, সেই দৃষ্টিই যেন সরাসরি তার দিকে নিবদ্ধ। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি যেন বলছে, “তুমি যতই চেষ্টা করো, আমার রহস্য তুমি কখনো ভেদ করতে পারবে না।”
১৯১১ সালের ২১ আগস্ট তাই শুধু একটি চুরির দিন নয়; এটি শিল্পের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়। একজন সাধারণ কর্মীর সাহস, এক জাতির আবেগ, আর এক চিত্রকর্মের অদ্ভুত শক্তি মিলে গড়ে তুলেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। আজও যখন লুভ মিউজিয়ামে মোনালিসার সামনে দাঁড়ানো যায়, তখন মনে হয় তিনি কেবল ছবি নন—তিনি রহস্য, তিনি ইতিহাস, তিনি মানুষের হৃদয়ের গভীরতম আবেগের প্রতীক।








