নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
শুক্রবার মুসলিম বিশ্বের কাছে শুধু একটি দিন নয়, এটি আধ্যাত্মিক মিলনমেলারও দিন। ইসলামি পরিভাষায় এ দিনকে বলা হয় “সায়্যিদুল আয়াম” বা দিনের সর্দার। কোরআনে সূরা জুমায় বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! যখন জুমার দিনে নামাজের আহ্বান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দাও।” (সূরা জুমা: ৯)।
তবে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা একই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হলেও শুক্রবার পালনের রূপ ভিন্ন ভিন্ন। ভূগোল, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে প্রতিটি দেশে এ দিনের আঙ্গিক আলাদা।
মধ্যপ্রাচ্য: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত:
মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু সৌদি আরবেই শুক্রবারের আবহ সবচেয়ে প্রকট। ভোর থেকেই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় মুসল্লিদের ঢল নামে। কাবা শরিফে লাখো মানুষ একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেন। জুমার দিনকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকায় সেদিন বাজার, অফিস-আদালত প্রায় বন্ধ থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে শুক্রবারের আবহ আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। অফিসিয়ালি সপ্তাহান্ত শুরু হয় শুক্রবার থেকে। জুমার নামাজের আগে নাগরিকরা পরিবার নিয়ে প্রাতঃভ্রমণ, শপিং মল ঘুরে দেখা কিংবা সৈকতে সময় কাটান। তবে দুপুর নাগাদ সবাই মসজিদে সমবেত হন। দুবাইয়ের বড় মসজিদগুলোতে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষ নামাজ আদায় করেন।
দক্ষিণ এশিয়া: ভারত ও পাকিস্তান:
ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে শুক্রবারে মসজিদমুখী মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। দিল্লির জামা মসজিদে প্রতি জুমায় লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হন। তবে ভারতে শুক্রবার সরকারি ছুটি না হওয়ায় অনেক মুসলমান অফিস বা ব্যবসা থেকে ছুটি নিয়ে নামাজে অংশ নেন।
পাকিস্তানে শুক্রবার জাতীয় ছুটি। ইসলামাবাদ বা লাহোরের বড় মসজিদগুলোতে সরকারিভাবে বিশেষ খুতবা হয়। নামাজ শেষে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় সমাবেশও করে। সামাজিকভাবে শুক্রবারে পারিবারিক আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন, বিশেষ রান্নার প্রচলন রয়েছে।
আফ্রিকা: মিশর, সুদান ও নাইজেরিয়া:
মিশরে শুক্রবারকে ঘিরে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। কায়রোর আল-আজহার মসজিদে খ্যাতনামা আলেমরা খুতবা প্রদান করেন, যা দেশের নানা প্রান্তে সম্প্রচারিত হয়। নামাজ শেষে সাধারণ মানুষ কুশারি বা মাছভাত খেতে পরিবার-পরিজন নিয়ে রেস্তোরাঁয় যান।
সুদানে শুক্রবারকে সামাজিক সম্পর্ক জোরদারের দিন বলা হয়। মানুষ সকাল থেকেই আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া-আসা করে। আর নাইজেরিয়ায় মুসলমানরা দুপুরে নামাজ পড়ে বিকালে ঐতিহ্যবাহী বাজারে জমায়েত হন। এদিন সেখানে ব্যবসার জোয়ার থাকে।
মধ্য এশিয়া: তুরস্ক, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান:
তুরস্কে শুক্রবার সরকারি ছুটি নয়, তবে সরকারিভাবে দুপুরের পর অফিস-আদালতে ছুটি দেওয়া হয় যাতে সবাই জুমার নামাজ আদায় করতে পারে। ইস্তাম্বুলের নীল মসজিদ বা হায়া সোফিয়ার সামনে শুক্রবারে পর্যটক ও মুসল্লিদের মিলনমেলা হয়। নামাজ শেষে স্থানীয়রা চা ও সিমিত (তুর্কি রুটি) খেতে খেতে আড্ডায় মেতে ওঠেন।
উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে শুক্রবার রাষ্ট্রীয় ছুটি না হলেও ধর্মীয় আবেগ প্রবল। তাসখন্দ বা আলমাতির বড় মসজিদগুলোতে মানুষ ব্যাপক ভিড় করে। নামাজ শেষে স্থানীয়রা ঐতিহ্যবাহী খাবার প্লভ (মাংস দিয়ে ভাত) খেতে খেতে সামাজিক মেলামেশায় যুক্ত হন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া:
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ। শুক্রবার সেখানে ধর্মীয় আবহ গভীর হলেও এটি পুরো দিন ছুটি নয়। সাধারণত অফিস ও স্কুলগুলো দুপুরের আগে বন্ধ হয়ে যায়, যাতে মানুষ নামাজে অংশ নিতে পারে। জাকার্তার ইস্তিকলাল মসজিদে প্রায় এক লাখ মানুষ একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেন।
মালয়েশিয়ায় শুক্রবার আঞ্চলিকভাবে ছুটি। বিশেষ করে কেলান্তান ও তেরেঙ্গানু প্রদেশে শুক্রবার-শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি, আর রাজধানী কুয়ালালামপুরে শনিবার-রবিবার ছুটি। ফলে শুক্রবারের পালনে ভিন্নতা দেখা যায়। অনেক পরিবার দুপুরে নামাজ শেষে বিশেষ নাসি লেমাক বা মাছভাত রান্না করে।
পশ্চিমা দেশসমূহ: যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র:
অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমা দেশগুলোতে শুক্রবার আলাদা ছুটির দিন নয়। তাই সেখানকার মুসলিমরা নিজেদের মতো করে দিনটি পালন করেন। যুক্তরাজ্যে লন্ডনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার মুসল্লি জড়ো হন। অফিস সময়ের কারণে দুই বা তিনটি পৃথক জামাত হয়।
ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসীরা শুক্রবারে দুপুরের সময় ছুটি নিয়ে নামাজে অংশ নেন। তবে জায়গার সংকটে অনেক সময় রাস্তার ধারে বা খোলা প্রাঙ্গণে জামাত বসাতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা শুক্রবারে মসজিদে সমবেত হন, তবে পুরো দিন ছুটি না থাকায় জুমার নামাজেই আবদ্ধ থাকে বিশেষ আয়োজন। নামাজ শেষে অনেক মসজিদে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, কিশোরদের জন্য ইসলামি শিক্ষা সেশন আয়োজন করা হয়।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও অভিন্নতা:
এখন যদি সার্বিকভাবে দেখা যায়, তাহলে কয়েকটি মিল পাওয়া যায়:
- জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে বিশেষ গুরুত্ব: সব দেশে মানুষের সমাবেশ ও আধ্যাত্মিক আবহ দৃশ্যমান।
- সামাজিক সম্পর্ক মজবুত করা: নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা।
- বিশেষ খাবার: মিশরে কুশারি, মালয়েশিয়ায় নাসি লেমাক, তুরস্কে সিমিত—খাবারের বৈচিত্র্যে শুক্রবার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
তবে পার্থক্যও রয়েছে:
- কোথাও (সৌদি, পাকিস্তান) পুরো দিন সরকারি ছুটি, কোথাও (তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া) আংশিক ছুটি, আবার কোথাও (ইউরোপ-আমেরিকা) কোনো ছুটি নেই।
- খুতবার বিষয়বস্তু ও রাজনৈতিক ব্যবহার অনেক দেশে ভিন্ন। পাকিস্তান বা মিশরে খুতবা কখনো রাজনৈতিক আলোচনায় রূপ নেয়, আবার সৌদিতে তা কেবল ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দেয়।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে শুক্রবার:
বিশ্বায়ন ও আধুনিকতার কারণে শুক্রবারের চর্চায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে শপিং মল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে শুক্রবারকে ঘিরে। দক্ষিণ এশিয়ায় নামাজ শেষে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বেড়েছে। পশ্চিমা দেশে শুক্রবার তরুণ প্রজন্মের কাছে শুধু নামাজ নয়, বরং পরিচয় ও
শুক্রবারের মর্ম একটাই—আল্লাহর ইবাদত ও মুসলিম সমাজের ঐক্যবদ্ধতা। তবে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে এ দিনের পালনে ভিন্নতা এসেছে। কোথাও এটি সাপ্তাহিক ছুটি, কোথাও আংশিক ছুটি, কোথাও আবার কেবল ধর্মীয় সময়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই শুক্রবার মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধনের দিন।








