(প্রতীকী ছবি)
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
জাপানের ওসাকা শহরের এক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে শুক্রাণুদাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। সন্তানের জন্ম নিতে ইচ্ছুক অথচ বন্ধ্যত্বে ভুগা দম্পতি বা অবিবাহিত নারীদের জন্য হাজিম নামের এই তরুণ একটি নতুন ধরনের সমাধান তৈরি করেছেন। তবে এই দানের পদ্ধতি শুধু চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে হচ্ছে। এই কারণে তাঁর কর্মকাণ্ড সামাজিক ও নৈতিকভাবে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জাপানি তরুণের নাম হাজিম (ছদ্মনাম)। হাজিমের প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল এক বন্ধুর পরিবারের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার এক সহপাঠী তাঁকে অনুরোধ করেন, তার স্ত্রীকে সন্তানধারণে সাহায্য করতে। বন্ধুর বন্ধ্যত্বের কারণে তার স্ত্রী সন্তান নিতে পারছিলেন না। প্রথমে এই প্রস্তাব পেয়ে হকচকিয়ে যান হাজিম, কিন্তু পরে পরিবারকে সুখী করার উদ্দেশ্যে রাজি হয়ে যান। তাঁর শুক্রাণুর সাহায্যে বন্ধুর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হন এবং সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন। সেই পরিবারের আনন্দ ও সন্তুষ্টি দেখেই হাজিম সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আরও অনেককে যাতে সাহায্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে বিনামূল্যে এই পরিষেবা চালু করবেন।
হাজিম এই সেবার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে কোনো অর্থ নেন না। আগ্রহী সেবা গ্রাহকরা শুধুমাত্র যাতায়াতের খরচ বহন করেন। তবে হাজিমের শর্ত রয়েছে—শুধু যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলেই তিনি শুক্রাণু দান করবেন। কৃত্রিম প্রজনন বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি এখানে প্রযোজ্য নয়। হাজিম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর শুক্রাণু থেকে জন্ম নেওয়া শিশুর জন্য তিনি কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন না, পিতৃত্বের দাবি জানাবেন না এবং কোনো আর্থিক দায়ও নেবেন না।
প্রথমে হাজিম ভেবেছিলেন, শুধুমাত্র বন্ধ্যত্বে ভুগা দম্পতিরাই তাঁর কাছে আসবেন। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, বেশির ভাগ আগ্রহী সেবা গ্রাহকই সমকামী দম্পতি ও অবিবাহিত মহিলা। এই ধরনের গ্রাহকরা বিয়ের বাধা ছাড়া সন্তান চান। হাজিমের মতে, সমাজে অনেকেই সন্তান কামনার জন্য বিয়ে বাধ্যতামূলক মনে করেন না। তাঁর সেবার মাধ্যমে এই মানুষগুলো তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন বলে হাজিম মনে করে।
জানা যায়, হাজিম এখন পর্যন্ত ২০টির বেশি অনুরোধ পেয়েছেন। এর মধ্যে সাতজন নারী সফলভাবে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন এবং চারটি শিশুর জন্ম ইতিমধ্যেই হয়েছে। হাজিম মনে করেন, তাঁর উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক মানুষের জীবনকে আনন্দময় করা সম্ভব হয়েছে। তবে সমাজে তুমুল বিতর্কও জন্ম দিয়েছে হাজিমের এই অভিনব উদ্দ্যোগ। অনেকে তাঁর সাহসকে স্বাগত জানালেও, অনেকে এটিকে নৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছেন।
হাজিমের এই কার্যকলাপের আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাপানে ব্যক্তিগতভাবে শুক্রাণু দান বা অনলাইন প্রচার নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই। তাই হাজিম সরাসরি কোনো আইনের লঙ্ঘন করছেন না বলে মত প্রকাশ করেন অনেকে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সন্তানদের পিতৃপরিচয় না থাকা এবং আর্থিক দায় না নেওয়ার বিষয়গুলো ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নানান প্রশ্ন ও জটিলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মনোবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জন্মদাতা পিতার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় শিশুদের উপর মানসিক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সমর্থকরা বলছেন, আধুনিক সমাজে পরিবার গঠনের ধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে। মা-বাবা, মা-মা, বাবা-বাবা মিলেও পরিবার গড়ে ওঠা সম্ভব। তাই হাজিমের মতো দাতাদের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
হাজিম নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানাননি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন এবং সেখানেই আগ্রহীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে তিনি নিজের পরিবার বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। হয়তো ব্যক্তিগত জীবন গোপন রাখাটাই তাঁর উদ্দেশ্য।
হাজিম জানিয়েছেন, যতদিন সম্ভব তিনি এই পরিষেবা চালিয়ে যেতে চান। অর্থনৈতিক লাভের কোনো লক্ষ্য তার নেই। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তবে হাজিমের এই সেবা নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিষেবা কতদিন সামাজিক ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকবে, তা এখনো অজানা।
হাজিমের উদ্যোগ একদিকে যেমন সমাজে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, অন্যদিকে নৈতিকতা, সামাজিক কাঠামো ও আইনি দিক থেকে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সন্তান গ্রহণে ইচ্ছা থাকা মানুষরা যারা নানান কারনে সন্তান জন্ম দিতে পারছে না তারা হাজিমের এই সেবার মাধ্যমে নতুন আশার আলো দেখছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর কেমন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন এখনও উন্মুক্ত।
তবে হাজিমের এই কার্যকলাপ যতই নতুনত্ব বা সহানুভূতির দাবি করুক না কেন, এর ঝুঁকি কম নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এভাবে শুক্রাণু দান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, একই সঙ্গে সন্তানদের ভবিষ্যৎ আইনি ও সামাজিক পরিচয় নিয়েও জটিলতা দেখা দিতে পারে। আর এমন অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া সমাজে নৈতিক প্রশ্নও উসকে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: South China Morning Post








